Spread the love

দুধকে বলা সুপার ফুড বা সর্বগুণ সম্পন্ন খাবার। এতে রয়েছে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ডি, ভিটামিন-১২, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, নিয়াসিন ও রিবোফ্লভিন। দুধের নানা পুষ্টিগুণ সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। ডায়েটের ক্ষেত্রেও দুধের বিকল্প নেই। তাই দৈনিক খাদ্যতালিকায় দুধ রাখা খুবই জরুরী।

যে কারণে নিয়মিত দুধ খাবেনঃ

  • দুধে থাকা প্রোটিন মাংসপেশির গঠনে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। এটি মাংসপেশির আড়ষ্টতা দূর করতে সক্ষম।
  • হৃদপিণ্ডের পেশির সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত দুধ পান করা উচিত। এতে উপস্থিত খনিজ উপাদান হৃদপিণ্ড সতেজ রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  • নিয়মিত এটি খেলে আমাদের শরীরে সেরোটোনিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই উপাদান শরীরে পর্যাপ্ত সৃষ্টি হলে মন ভালো থাকে। এজন্য একে অনেকে ‘হ্যাপি হরমোন’ বলেও থাকেন।
  • দুধে রয়েছে ভিটামিন মিনারেলসহ নানা পুষ্টিগুণ। তাই প্রতিদিন দুধ পান করলে ত্বক নরম, কোমল ও মসৃণ হয়।
  • নিয়ম করে নিয়মিত দুধপানে আর্টারিওস্ক্যারোসিস রোগে আক্রান্ত সম্ভাবনা কমে যায়। এ রোগ হলে আমাদের আর্টারিগুলোর দেয়াল পুরু, শক্ত ও অস্থিতিস্থাপক হয়ে শরীরের রক্তচলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। একারণে হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে।

  • দুধের পুষ্টি উপাদান দেহের ইমিউন সিস্টেমকে উন্নত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি কলেস্টোরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং রক্ত পরিষ্কারের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালনও বৃদ্ধি করে।
  • দুধের একটি বড় উপকারিতা হচ্ছে এটি মানসিক চাপ দূর করে, মস্তিষ্ক শিথিল রাখে।
  • পর্যাপ্ত দুধপান করলে মলাশয় ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়।

আরও পড়ুনঃ রক্ত কেন দেবেন? জেনে নিন রক্তদানের উপকারিতা ও অপকারিতা।

  • ছোট ও বাড়তি বয়সের শিশুদের কে নিয়মিত দুধ খাওয়ালে তাদের শরীর ও মন প্রফুল্ল এবং সতেজ থাকে। তার ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারবে। এই সময় দেহের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পেতে প্রতি দিন ২ গ্লাস করে দুধ খাওয়া প্রয়োজন।
  • আর্থ্রাইটিস ফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে নিয়মিত দুধ পান হাড়ের জয়েন্টগুলোর ক্যালসিফিকেশন প্রতিরোধ করতে পারে।

  • ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি-এর সবচেয়ে বড় উৎস হলো দুধ। তাই হাড়কে শক্তিশালী করতে এবং এর নমনীয়তা প্রতিরোধ করতে নিয়মিত দুধ পান করা প্রয়োজন।
  • বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তির হাড়ের ক্ষয় রোধ করার জন্য দুধ খাওয়া আবশ্যক। সরাসরি দুধ অনেকে হজম করতে না পারলে কম চর্বিযুক্ত দুধ এবং কম চর্বিযুক্ত দুধের দই নিয়মিত গ্রহণ করলে ভালো।

দুধ পানে মেনে চলতে হবে যেসব নিয়মঃ

  • পরিপাকতন্ত্রে আলসার থাকলে আথবা যাদের পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে তারা দুধ খেতে পারবেন না।
  • ল্যাকটোবায়োনিক এসিডে বা সুগার এসিডের অভাব যাদের রয়েছে তাদের দুধ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
  • ফল ও দুধের মিশ্রণ করে জুস বানিয়ে খাওয়া যাবে না। কারণ, এই মিশ্রণ হজমের সমস্যা তৈরি করে।
  • অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার রোগী দুধ খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

  • যারা প্রতিদন ট্যাবলেট খাচ্ছেন রক্তে লৌহ বা আয়রণের অভাব পূরণের জন্য তাদের উচিত দুধ না খাওয়া।
  • খাদ্যনালীতে কোনো প্রকারের ক্ষতরোগ থাকলে দুধ খাওয়া এড়িয়ে যাওয়া উচিত।
  • যারা বদহজম বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগেন তারা খালি পেটে দুধ পান করা এড়িয়ে চলুন।
  • কিডনিতে পাথর থাকা রোগীদের দুধ কম খাওয়া উচিত এবং রাতে একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে।
  • যাদের শরীরে ‘ল্যাক্টেজ’ (Lactase) নামক এনজাইমের অভাব আছে  তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দুধ খেতে হবে।
  • যারা সিসা নিয়ে কাজ করেন, তাদের উচিত দুধ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান হওয়া। কারণ দুধে থাকা ল্যাক্টোজ ও সিসার বিষক্রিয়ায় পেট ব্যাথা এবং অনিদ্রাসহ নানা ধরণের রোগ হতে পারে।

  • অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা প্যানক্রিয়েটিটিস  রোগে আক্রান্ত রোগীদের দুধ না-খাওয়া উত্তম।
  • আমাদের শরীরে নানাবিধ সমস্যা তৈরি করে বাসি দুধ। তাই বাসি দুধ পান করা থেকে বিরত থাকুন।
  • দুধ আপনার এলার্জি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ এলার্জির রোগীদের দুধ খেতে নিষেধ করেন। এলার্জির রোগীরা দুধ খেলে অন্ত্র ফুটো হয়ে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পাড়ুনঃ ছোলা খান সুস্থ থাকুন।

  • নোনতা জাতীয় খাদ্য খাওয়ার দুধ পান করা ক্ষতিকর।
  • যাদের ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশের আলসার তথা ডিওডেনাল আলসার আছে বা যাদের ‘কোলেসিসটিটিস’ তথা গলব্লাডারের সমস্যা আছে তাদের দুধ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। কারণ, দুধ ডিউডেনাল আলসার ও গলব্লাডারের রোগীর রোগ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধের মিশ্রণ করে কখনো অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। তবে আয়ুর্বেদিক ওষুধ দুধ দিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

দুধ ঠান্ডা না গরম খাবেনঃ

  • গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় যারা ভুগেন, তাদের জন্য ঠান্ডা দুধ খুবই উপকারী। এতে বুক ও পেট জ্বালাপোড়া কমে। তাই খাবার খাওয়ার পর রোজ আধা গ্লাস ঠান্ডা দুধপান করুন। ওষুধ ছাড়াই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমবে যাবে।
  • ঠান্ডা দুধে প্রচুর ইলেকট্রোলাইট থাকায় ডিহাইড্রেশন দূর করে। এটি শরীরে পানির মাত্রা ঠিক রেখে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
  • মহিলাদের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সমস্যা দূর করতে প্রতিদিন রাতে এক গ্লাস গরম দুধপান করা উচিত।
  • ১ গ্লাস ঠান্ডা দুধপান করলে অনেকক্ষণ ধরে আর কিছু খাওয়ার আগ্রহ থাকে না। এতে করে বেশি খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং অতিরিক্ত ওজন কমতে থেকে।
  • গরম দুধে ল্যাকটোজেনের পরিমাণ কম থাকে এজন্য সহজে হজম হয়।

  •  দুধথেকে তৈরি খাবার যাঁদের হজম হয় না, তাঁদের খেতে হবে গরম দুধ। অপরর দিকে ঠান্ডা দুধ তুলনায় ভারী এবং হজম করা কষ্ট।
  • দুধগরম করা হলে অ্যামিনো অ্যাসিড সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস গরম দুধপান করলে ঘুম ভালো হবে।
  • ঠান্ডায় আক্রান্ত হলে, হালকা গরম দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে পান করলে ঠান্ডা দূর হয়।
  • যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে তারা রাতে ঘুমনোর আগে প্রতিদিন এক গ্লাস গরম দুধপান করলে উপকার পাবেন।
  • মেয়েদের পিরিয়ডকালীন ব্যথা দূর করার জন্য গরম দুধের সাথে হলুদ মিশিয়ে পান করলে ভালো উপকার হয়।
  • যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে তারা রাতে ঘুমনোর আগে প্রতিদিন এক গ্লাস গরম দুধপান করলে উপকার পাবেন।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে দেহ ও পেশীগুলো সুগঠিত করতে সকালে বা বিকেলে এক্সারসাইজ করার পর গরম দুধপান করা উচিত।

দুধের অদ্ভুত ও অসাধারণ কিছু ব্যবহারঃ

  • মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে ১:৪ অনুপাতে দুধে পানি মিশিয়ে বাগানে ছিটিয়ে দিন। দেখবেন মাটির উর্বরতা শক্তি বেড়ে গেছে।
  • টক দুধদিয়ে কাঠের আসবাবপত্র সহজে পলিস করতে পারেন।
  • দুধে সামান্য পানি এবং ১ চিমটি লবন মিশিয়ে পোকামাকড়ের কামড়ের ওপর লাগান। এর এনজাইম দ্রুত জ্বলুনি কমিয়ে অ্যালার্জির হাত থেকে রক্ষা করবে।
  • কাপড় থেকে কালির দাগ দূর করতে, দাগে দুধভিজিয়ে সারারাত রেখে দিন। পরে ভালো করে ঘষে ধুয়ে নিলে দেখবেন কালির দাগ উঠে গেছে।
  • ধাতব জিনিসের মরিচা দূর করতে দুধে ভিজিয়ে ঘষে নিন।

  • চিনামাটির পাত্রের ফাটা দাগ দূর করতে হলে পাত্রটি দুধের মধ্যে দিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকুন, দুধফুটে উঠলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিন। দুধথেকে পাত্রটি তুলে দেখবেন ফাটা দাগ সম্পূর্ন দূর হয়ে গেছে। দুধে থাকা প্রোটিন চিনামাটির সাথে মিশে ফাটা অংশ জোড়া লাগতে সাহায্য করে।
  • মাছের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে ও গন্ধ দূর করার জন্য, ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে ৩০ মিনিট দুধ মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন তার পর ধুয়ে রান্না করুন।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বের জানা অজানা অদ্ভুত ও অবাক করা তথ্য।

দুধ খাওয়ার উপযুক্ত সময়ঃ

দুধ খাওয়ার উপযুক্ত সময় হলো- সকালের নাস্তার সাথে, বিকেল চারটার দিকে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আধা ঘন্টা আগে। এ তিনটি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে রাতের বেলা। তবে রাতে এটি খেলে অনেকের হজমের সমস্যা দেখা দেখা দিতে পারে।

দৈনিক কতটুকু দুধ পান করা উচিতঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ( WHO ) পরামর্শ অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক গড়ে  ২৫০ মিলিলিটার বা ২৫৭.৫ গ্রাম দুধপান করা উচিত।

জেনে রাখুনঃ

  • উচ্চ তাপমাত্রায় দুধফুটিয়ে পান করতে হবে।
  • কলার সাথে খেলে বিষাক্ত পদার্থ গুলো শরীর থেকে বের হতে পারে না। এতে করে সর্দি, কাশি, অ্যালার্জির মত সমস্যা দেখা দেয়।
  • এটি খাওয়ার আগে বা পরে টক জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • পেঁয়াজ ও বেগুনের সঙ্গে দুধখেলে ত্বকের নানা ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • মাছ ও মাংসের সাথে দুধখেলে অনেক সময় ত্বকে সাদা দাগ দেখা যায়।
  • সকালে খালি পেটে দুধপান করলে যাদের কোনো সমস্যা হয় না, তারা খালি পেটে পান করতে পারেন। তবে যাদের শর্করায় সমস্যা আছে তাদের কিছু খেয়ে তারপর দুধধেপান করা ভালো।
  • দুধের সাথে দই শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
  • দুধের সাথে ডিম খেলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।


Spread the love