বিল গেটস বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যিনি শুধু প্রযুক্তি জগৎকেই বদলে দেননি বরং মানবকল্যাণমূলক কাজেও এক অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করে ব্যক্তিগত কম্পিউটারকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন এবং আধুনিক প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তবে তার জীবনের অনেক দিক রয়েছে যা অনেকেই জানে না, আর সেসব তথ্য সত্যিই অবাক করার মতো। ছোটবেলা থেকে তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌতূহল তাকে আলাদা করে তুলেছিল, যা ভবিষ্যতে তাকে একজন মহৎ উদ্যোক্তায় পরিণত করে। তাই বিল গেটসের অজানা তথ্য জানলে শুধু তার সাফল্যের রহস্যই নয়, জীবনের নানা অনুপ্রেরণাও খুঁজে পাওয়া যায়।
বিল গেটস সম্পর্কে অজানা তথ্য
- বিল গেটস ছোটবেলায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে এতটাই আসক্ত ছিলেন যে স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতেন। তিনি কোড লিখতে গিয়ে প্রায়ই রাত জেগে থাকতেন। তাঁর প্রথম প্রোগ্রাম ছিল একটি টিক-ট্যাক-টো গেম। এই অভ্যাসই ভবিষ্যতে তাঁকে প্রযুক্তি জগতে বিপ্লব ঘটাতে সাহায্য করে।
- তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রোগ্রামিং শুরু করেন। তখন তিনি BASIC ভাষায় কাজ করতেন। ছোটবেলায় এক বন্ধুর সাথে মিলে বিভিন্ন ছোট সফটওয়্যার বানিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়েই তাঁর মাইক্রোসফট সাম্রাজ্যের বীজ রোপিত হয়।
- বিল গেটসের পুরো নাম হলো উইলিয়াম হেনরি গেটস থার্ড। পরিবারে তাঁকে “ট্রে” নামেও ডাকা হতো। তাঁর বাবাও আইনজীবী ছিলেন, ফলে পরিবারে শিক্ষার উপর জোর ছিল।
- তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেননি। তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সফটওয়্যার ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েন। এ সিদ্ধান্তটাই ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। অনেকেই বলেন, যদি তিনি পড়াশোনা শেষ করতেন, তবে হয়তো আজকের মাইক্রোসফট জন্ম নিত না।
- ১৯৭৫ সালে গেটস তাঁর বন্ধু পল অ্যালেনের সাথে মিলে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা শুরু করেছিলেন আলবুকার্ক নামক একটি শহরের ছোট্ট অফিস থেকে। প্রথম দিকে তাঁরা BASIC ইন্টারপ্রেটার তৈরি করে নাম কামান। পরে উইন্ডোজই তাঁদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়ে ওঠে।
- শুরুতে তিনি মাইক্রোসফটের প্রতিটি কাজ তত্ত্বাবধান করতেন। কোড লেখা থেকে ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ—সবকিছুতেই তাঁর প্রভাব ছিল। এমনকি অনেক সফটওয়্যারের কোডের অংশ তিনি নিজেই লিখেছিলেন। এর ফলে তিনি একজন ম্যানেজার ও প্রোগ্রামার-দুই ভূমিকাতেই সমান দক্ষ ছিলেন।
- তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী বিলিয়নিয়ারদের একজন ছিলেন। ৩১ বছর বয়সে তিনি বিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হন। পরবর্তী প্রায় ১৮ বছর এই অবস্থান ধরে রাখেন।
- বিল গেটস পড়তে খুব ভালোবাসেন। তিনি বছরে ৫০টিরও বেশি বই পড়েন। পড়াশোনার মাধ্যমে তিনি নতুন আইডিয়া ও জ্ঞান অর্জন করেন। এজন্য তিনি অনেককে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়ার পরামর্শ দেন।
- তিনি অল্প বয়সে দাবা খেলায়ও আগ্রহী ছিলেন। তিনি দাবাকে মানসিক ব্যায়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মনে করতেন। প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বাড়াতে দাবা তাঁর কাছে ছিল সহায়ক। পরে তিনি ব্যবসায়ও একই কৌশলগত চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করেন।
- বিল গেটস তাঁর সন্তানদের বড় অঙ্কের সম্পদ দিয়ে যাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, সন্তানদের নিজেদের পরিশ্রমে সফল হতে হবে। এজন্য তিনি দাতব্য কাজে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দান করেছেন। তাঁর নীতি হলো-অতিরিক্ত সম্পদ উত্তরাধিকারীদের অলস করে দেয়।
- তিনি বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি দাতব্য সংস্থা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে এর ভূমিকা অসাধারণ। এই ফাউন্ডেশন আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশকে সাহায্য করে।
- তিনি এক সময়ে ইন্টারনেটের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন ইন্টারনেট বড় কিছু হবে না। পরে তিনি ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত মাইক্রোসফটে ইন্টারনেট সেবা যুক্ত করেন। তখনই জন্ম নেয় Internet Explorer।
- তিনি ছোটবেলায় গণিত ও বিজ্ঞানে ভীষণ ভালো ছিলেন। স্কুলে শিক্ষকরা তাঁকে “প্রতিভাবান শিশু” হিসেবে দেখতেন। তিনি সবসময় জটিল সমস্যার সমাধানে আগ্রহী ছিলেন। এই কারণেই প্রোগ্রামিং তাঁর কাছে খেলার মতো হয়ে যায়।
- তিনি একবার ট্রাফিক আইন ভাঙার জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে নিউ মেক্সিকোতে তিনি স্পিডিং এবং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানোর জন্য ধরা পড়েন। এ নিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত মগশট ছবিও আছে। আজও সেটি ইন্টারনেটে জনপ্রিয়।
- গেটস মাইক্রোসফটের প্রথম কর্মীদের একজন ছিলেন, যিনি কোড লিখতেন এবং পণ্য তৈরি করতেন। প্রাথমিক সংস্করণের অনেক উইন্ডোজ সফটওয়্যারে তাঁর সরাসরি লেখা কোড ছিল। এটি প্রমাণ করে তিনি শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না, একজন প্রকৃত প্রযুক্তিবিদও ছিলেন। এই দক্ষতাই তাঁকে আলাদা করেছে।
- তিনি কিশোর বয়সেই একটি কোম্পানির পেরোল সফটওয়্যার বানিয়েছিলেন। তাঁর বানানো সফটওয়্যারটি স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো। এত অল্প বয়সে ব্যবসায়িক দিকটা বোঝা তাঁর ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলে। এখান থেকেই তিনি উদ্যোক্তা মানসিকতা অর্জন করেন।
- গেটস তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতেন। পল অ্যালেনের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব মাইক্রোসফটের জন্ম দিয়েছিল। এমনকি স্টিভ বালমারও ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় বিশ্বস্ত সহযোগী বেছে নিতেন।
- তিনি প্রযুক্তি জগতে প্রতিযোগিতাকে স্বাভাবিকভাবে নিতেন। বিশেষ করে স্টিভ জবসের সাথে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিখ্যাত। যদিও তারা ব্যবসায়িকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন। স্টিভ জবস মৃত্যুর আগে গেটস তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন।
- গেটস ফাউন্ডেশন বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন সরবরাহে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ম্যালেরিয়া ও পোলিও প্রতিরোধে তিনি বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় অনেক অঞ্চলে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে গেছে। এ জন্য তাঁকে মানবতার দাতা বলা হয়।
- তিনি প্রায়ই নিজের বাড়িতে বড় বড় বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের আমন্ত্রণ জানান। তাঁদের সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে তাঁর আগ্রহ সীমাহীন। এমনকি অবসরে থেকেও তিনি এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
- তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পছন্দ করেন। অনেক সময় তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে। যেমন—তিনি আগে বলেছিলেন অনলাইন পেমেন্ট, ব্যক্তিগত সহকারী সফটওয়্যার, আর স্মার্ট ডিভাইস ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। আজ সেগুলো বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
- তিনি নিজের খাদ্যাভ্যাসে সাধারণ জীবনযাপন করেন। বার্গার আর কোলা তাঁর প্রিয় খাবার। এমনকি ধনী হওয়ার পরও তিনি সহজ খাবার খেতে পছন্দ করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সরলতা বজায় রাখেন।
- গেটস শিশুদের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। তাঁর সন্তানদের শৈশবে তিনি তাদের সাথে খেলাধুলা করতেন। যদিও তিনি কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তবুও পরিবারকে গুরুত্ব দিতেন। এজন্য তিনি সবসময় কাজ ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতেন।
- তিনি কম্পিউটার ভাইরাস এবং নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকতেন। এজন্য তিনি মাইক্রোসফটে সাইবার নিরাপত্তার ওপর জোর দেন। আজকের দিনে সাইবার সিকিউরিটি একটি বড় শিল্পে পরিণত হয়েছে। তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
- গেটস একজন উড়োজাহাজ প্রেমী। তিনি প্রায়ই প্রাইভেট জেটে ভ্রমণ করেন। ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি জানার সুযোগ পান। এছাড়া বিশ্ব সমস্যার সমাধান খুঁজতেও তিনি ভ্রমণকে কাজে লাগান।
- তিনি একসময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পরে গবেষণা দেখে তিনি এ বিষয়ে সক্রিয় হন। আজ তিনি নবায়নযোগ্য শক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছেন। তাঁর লক্ষ্য বিশ্বকে আরও সবুজ করা।
- বিল গেটস প্রায়ই সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে মাইক্রোসফটের একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ উঠেছিল। অনেক দেশ তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। তবে এসবের মধ্য দিয়েই তিনি ব্যবসায় কৌশলী হিসেবে টিকে গেছেন।
- তিনি সঙ্গীত শুনতেও ভালোবাসেন। বিশেষ করে রক সঙ্গীত তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে। কাজের ফাঁকে গান শুনে তিনি মন সতেজ রাখতেন। এতে তাঁর সৃজনশীলতাও বাড়ত।
- তিনি প্রতিদিন ডায়েরি লিখে থাকেন। নিজের কাজ, পরিকল্পনা এবং চিন্তা লিখে রাখেন। এতে তিনি অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। এটি তাঁর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের পরিচয় বহন করে।
- বিল গেটস ধাঁধা সমাধান করতে ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন ধাঁধা মস্তিষ্ককে শাণিত করে। ফাঁকা সময়ে তিনি জটিল ধাঁধা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এটি তাঁর সৃজনশীল মনোভাবের প্রতিফলন।
- তিনি একজন দক্ষ বক্তা। বড় বড় কনফারেন্সে তিনি অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন। প্রযুক্তি ও দাতব্য বিষয়ে তাঁর কথা শ্রোতাদের প্রভাবিত করে। এজন্য তাঁকে অনেক সময় ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক বলা হয়।
- গেটস খেলাধুলার মধ্যে টেনিসকে বেশি পছন্দ করেন। তিনি অনেক বড় খেলোয়াড়দের সাথে ম্যাচ খেলেছেন। তাঁর মতে, খেলাধুলা মন ও শরীরকে সতেজ রাখে। তাই অবসরে টেনিস খেলা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
- তিনি ছোটবেলায় স্কুলে কিছুটা একাকী স্বভাবের ছিলেন। সহপাঠীরা তাঁকে “গিক” বলে ডাকত। কিন্তু তিনি এতে বিরক্ত হতেন না। বরং তিনি নিজের মনোযোগ পড়াশোনা ও প্রযুক্তিতে রাখতেন।
- বিল গেটস নিজের বাড়িকে প্রযুক্তি-সক্ষম স্মার্ট হাউস বানিয়েছেন। বাড়িতে স্বয়ংক্রিয় আলো, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও সাউন্ড সিস্টেম রয়েছে। অতিথিরা প্রবেশের সময় তাদের পছন্দ অনুযায়ী পরিবেশ সেট করতে পারেন। এটি প্রযুক্তির এক চমৎকার উদাহরণ।
See also
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের অবাক করা অজানা কথা
বিয়ার গ্রিলস এর অজানা গল্প যা আপনাকে শিখাবে ঝুঁকি, সাহস ও বেঁচে থাকার কৌশল
কানাডা নিয়ে অজানা ২১টি তথ্য- যা কানাডার ইতিহাস ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আপনার ধারণা পাল্টে দেবে