পৃথিবীর ইতিহাস ও প্রকৃতির ভেতর এমন অনেক ঘটনা লুকিয়ে আছে, যা শুনলে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়, কিন্তু সত্যতা জানলে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না। কিছু রহস্য এতটাই অদ্ভুত যে বিজ্ঞানও তার ব্যাখ্যা দিতে হিমশিম খায়, আবার কিছু ঘটনা প্রমাণসহ ইতিহাসের পাতায় আজও ঝলমল করছে। মানুষের চোখে দেখা না–দেখা অনেক বাস্তব সত্য আমাদের চিন্তার সীমাকে চ্যালেঞ্জ করে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় অদ্ভুত কিন্তু সত্য রহস্যের। এ যেন বাস্তব আর অজানার এক মিশ্র পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি রহস্য উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়। আজ আমাদের এ সম্পর্কিত লেখা অদ্ভুত রহস্য – ২ ।
অদ্ভুত রহস্য কিন্তু সত্য
- মানুষের আঙুল ভাঁজ করলে যে ‘টুক’ শব্দ শোনা যায়, সেটা হাড় ভাঙার নয়—গ্যাস বুদবুদের বিস্ফোরণ। জয়েন্টের ভেতরের তরলের চাপ বদলানোয় এ ঘটনা ঘটে। তাই এটি মোটেও ক্ষতিকর নয়, তবে বারবার করলে জয়েন্ট ঢিলা হতে পারে। এই শব্দ বহু বছর ধরে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
- হামিংবার্ড একমাত্র পাখি যা পিছন দিকে উড়তে পারে। এর ডানার দ্রুত ঘূর্ণন এ দক্ষতা দেয়। এমনকি এক জায়গায় স্থির হয়ে বাতাসে ভাসতেও পারে। ক্ষুদ্র পাখি হলেও এর শক্তি অবিশ্বাস্য।
- মঙ্গল গ্রহে সূর্যাস্ত নীল রঙের দেখা যায়। কারণ মঙ্গলের ধুলিকণা আলোকে ভিন্নভাবে ছড়িয়ে দেয়। ফলে দিনের আলোর তুলনায় সন্ধ্যার আলো নীল হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সূর্যাস্তের বিপরীত রঙ দেখা সত্যিই বিস্ময়ের।
- কিডনি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ লিটার রক্ত ফিল্টার করে। তবে এর মাত্র ১–২ লিটার প্রস্রাব হিসেবে বের হয়। বাকি অংশ শরীরে আবার ফিরে যায়। কিডনি নষ্ট হলে শরীর বিষাক্ত পদার্থে ভরে যায়।
- পৃথিবীর গভীরে এমন হীরা পাওয়া গেছে যার ভেতরে পানি আটকে আছে। এ পানি পৃথিবীর জন্মকালীন সময়েরও পুরোনো হতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর গভীর স্তরে বিশাল সমুদ্র থাকতে পারে। এ আবিষ্কার এখনও গবেষণার রহস্য।
- হাঁসের ডাকের কোনও “ইকো” নেই—এটি মিথ, তবে সত্য হলো অনেক জায়গায় এ ইকো এত দুর্বল যে শোনা যায় না। কারণ এর শব্দের তরঙ্গ সমানভাবে ছড়ায়। ফলেই প্রতিফলনের অনুভূতি কমে যায়। এই কারণে ধারণা ছড়িয়েছিল যে ডাকের প্রতিধ্বনি নেই।
- জিরাফের গলা দীর্ঘ হলেও এর গলার হাড় মানুষের মতোই সাতটি। শুধু হাড়গুলো বড় আকারের। তাই লম্বা গলা থাকা সত্ত্বেও হাড়ের সংখ্যা অপরিবর্তিত। প্রকৃতির অদ্ভুত নকশা এমনই বিস্ময়কর।
- মানুষের হৃদয় স্টেথোস্কোপ ছাড়াই শোনা যায়, এমনকি শিশুরাও তা অনুভব করতে পারে। শরীরের ভেতরের স্পন্দন এত শক্তিশালী যে হাতে রাখলে অনেকে শুনতে পায়। হৃদস্পন্দন গতি আবেগ অনুযায়ী দ্রুত বদলায়। ভয়, আনন্দ, দুশ্চিন্তা—সবই হৃদয়ে ছাপ ফেলে।
- তেলাপোকা মাথা ছাড়া কয়েকদিন বেঁচে থাকতে পারে। কারণ তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস মাথার মাধ্যমে নয়, দেহের ছিদ্র দিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত তারা পানিশূন্য হয়ে মারা যায়। এ কারণে তেলাপোকাকে টেকসই প্রাণী বলা হয়।
- বজ্রপাত কখনো কখনো আবার একই জায়গায় আঘাত করে। বিশেষ করে উঁচু ভবন বা টাওয়ারে তা বেশি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং বছরে প্রায় ২০ বার বজ্রপাতের শিকার হয়। তাই বজ্রপাতের পুনরাবৃত্তি একেবারে স্বাভাবিক ঘটনা।
- সাপের চোখের পাতা নেই, তাই তারা চোখ বন্ধ করতে পারে না। একটি স্বচ্ছ স্তর সবসময় চোখ ঢেকে রাখে। এজন্য তাদের চোখ সবসময় খোলা মনে হয়। ঘুমানোর সময়ও তারা চোখ বন্ধ করে না।
- সমুদ্রের গভীর অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে কিছু আছে যা চাপের পরিবর্তনেই বিস্ফোরিত হয়ে মারা যায়। কারণ তাদের দেহের ভেতরে গ্যাস নেই। উপরিভাগে তুললে চাপে হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে দেহ ছিঁড়ে যায়। তাই তারা কেবল গভীর জায়গায়ই টিকে থাকে।
- গরুরাও বন্ধুত্ব করে এবং একে অপরের জন্য উদ্বিগ্ন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা কাছের বন্ধুকে না পেলে চাপ বাড়ে। এমনকি পালকেও তাদের সামাজিক সম্পর্ক থাকে। প্রাণীদের আবেগ সত্যিই বিস্ময়কর।
- মানুষের মস্তিষ্কে ব্যথা অনুভব করার কোনো স্নায়ু নেই। তাই মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে রোগী সচেতন থাকতে পারে। ব্যথা হয় মাথার টিস্যুতে, কিন্তু মস্তিষ্কে নয়। এটা সত্যিই ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য।
- মেরু ভাল্লুকের চামড়া আসলে কালো, শুধু লোম সাদা। এই কালো রং সূর্যের তাপ শোষণে সাহায্য করে। সাদা লোম আলো ছড়িয়ে দিয়ে তাদের বরফে আড়াল করে। তাই তারা শিকারীর চোখে ধরা পড়ে না।
- পৃথিবী প্রতিদিন প্রায় ১০০০ টন ভর হারাচ্ছে। এর বেশিরভাগই বায়ুমণ্ডল থেকে হালকা গ্যাস মহাকাশে পালিয়ে যাওয়ার কারণে। তবে সূর্যের বিকিরণ ও মহাজাগতিক ধূলিকণা পৃথিবীর ভর আবার বাড়ায়। ভারসাম্য বজায় থাকে বলেই বিপদ হয় না।
- বাঁদররা মানুষের মতো হাসতে পারে, যদিও শব্দ আলাদা। খেলতে বা খুশি হলে তারা মুখ খুলে দাঁত দেখায়। তাদের সামাজিক আচরণ মানুষের মতোই উন্নত। এজন্যই বিজ্ঞানীরা তাদের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের একটি গণ্য করেন।
- কিছু প্রজাতির পিঁপড়া নিজেদের দেহ দিয়ে সেতু বা ভেলা তৈরি করে সঙ্গীদের বাঁচায়। তারা সম্পূর্ণ সামাজিক এবং সংগঠিত। একজনের জীবন আরেকজনের জীবনের জন্য উৎসর্গ করে। এ আচরণ প্রাণীদের জগতে বিরল।
- শ্রীলঙ্কা এবং ভারত একসময় শারীরিকভাবে যুক্ত ছিল। “আদমস ব্রিজ” নামে পরিচিত পাথরের সারি দুটি দেশকে সংযুক্ত করেছিল। এখন এটি পানির নিচে ডুবে আছে। স্যাটেলাইট চিত্রে আজও এর চিহ্ন দেখা যায়।
- অক্টোপাসের রক্ত নীল রঙের কারণ এতে তামা–ভিত্তিক হেমোসায়ানিন থাকে। ঠান্ডা পানিতে অক্সিজেন বহনে এটি লোহাভিত্তিক রক্তের চেয়ে বেশি কার্যকর। তাই গভীর সমুদ্রেও তারা সহজে টিকে থাকে। প্রকৃতি তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাই রেখেছে।
- পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ হলো বাঁশ। দিনে প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এত দ্রুত বাড়ার ক্ষমতা খুব কম গাছের আছে। তাই বাড়িঘর থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে বাঁশ ব্যবহার করা হয়।
- পেঙ্গুইনরা দলবদ্ধ হয়ে ঠান্ডা থেকে নিজেদের রক্ষা করে। তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলায়। যাতে সবাই কিছুক্ষণ উষ্ণ জায়গায় দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। তাদের সামাজিক সমন্বয় সত্যিই অবিশ্বাস্য।
- মধ্যযুগে মানুষ ভাবত টমেটো বিষাক্ত। পরে জানা যায়, এটি পুরোপুরি নিরাপদ ও পুষ্টিকর। ভুল ধারণা এতটা শক্ত ছিল যে শত বছর ধরে মানুষ টমেটো খেত না। আজ টমেটো ছাড়া রান্না ভাবাই কঠিন।
- আইসক্রিম প্রথমে খাবার নয়, ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জ্বর কমাতে ঠান্ডা বরফ মিশ্রণ দেয়া হতো। সময়ের সঙ্গে এটি সুস্বাদু খাবারে রূপ নেয়। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ডেজার্টগুলোর একটি।
- শামুক তিন বছর পর্যন্ত ঘুমাতে পারে। যখন খাদ্য কমে যায় বা পরিবেশ প্রতিকূল হয়, তখন এটি ঘুমে আশ্রয় নেয়। ঘুমের সময় তাদের দেহের কার্যকলাপ অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়। এভাবে তারা কঠিন অবস্থাও পার করে।
- মানুষের শরীরে বিদ্যুৎ আছে-হৃদয় স্পন্দন এবং মস্তিষ্কের সংকেত এগুলোই বৈদ্যুতিক। শরীরের কোষগুলো ছোট ছোট বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এসব সংকেত মাপতে পারে। শরীরের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই এই সংকেতের ওপর নির্ভর করে।
- চাঁদের গন্ধ পোড়া গানপাউডারের মতো বলে জানিয়েছেন মহাকাশচারীরা। চাঁদের ধুলা স্যুটে লেগে গেলে সেই গন্ধ পাওয়া যায়। কেন এমন গন্ধ হয় তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এটি চাঁদের রসায়নের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
- সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় লাগে। তাই সূর্যের বর্তমান দৃশ্য আসলে ৮ মিনিট আগের। যদি সূর্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, আমরা তা প্রথমে টেরই পাব না। আলো ছড়িয়ে পৌঁছাতে সময় লাগে বলেই এমন হয়।
- গরিলারা মানুষের মতো হাতের ছাপ রেখে যায়। তাদের আঙুলের ছাপ এতটাই মানুষের মতো যে আলাদা করা কঠিন। এজন্য অপরাধ গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হাতের ছাপ প্রকৃতির এক অসাধারণ পরিচয়চিহ্ন। অদ্ভুত রহস্য – ২ অদ্ভুত রহস্য – ২ অদ্ভুত রহস্য – ২
See also
অদ্ভুত রহস্য – ১ : ইতিহাসের গভীরে লুকানো অজানা অবিশ্বাস্য সত্য তথ্য
অদ্ভুত রহস্য – ৩ : ইতিহাসের গভীরে লুকানো অজানা অবিশ্বাস্য সত্য তথ্য
কানাডা নিয়ে অজানা ২১টি তথ্য- যা কানাডার ইতিহাস ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আপনার ধারণা পাল্টে দেবে