ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia) একটি জটিল রোগ যেখানে রক্ত উৎপাদনকারী অস্থি মজ্জায় অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটে। ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হলেও এক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্রথমদিকে রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন, যা বিশ্রাম নেয়ার পরও কাটে না। ঘন ঘন জ্বর আসা কিংবা সামান্য কারণেই সংক্রমণ হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। অনেকের হাড়ে বা জয়েন্টে টানটান ব্যথা অনুভূত হয়, বিশেষ করে রাতে অস্বাভাবিকভাবে ঘাম হতে পারে। ত্বকে ছোট ছোট লাল দাগ দেখা দেয়া বা সামান্য আঘাতেই রক্ত পড়া ও দীর্ঘক্ষণ না থামাও লক্ষণীয়। এছাড়া কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়াকে অবহেলা করা উচিত নয়।
ব্লাড ক্যান্সার কী?
ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া (Leukemia) হলো রক্ত ও অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন এক ধরনের গুরুতর ক্যান্সার, যেখানে অস্বাভাবিক সাদা রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো স্বাভাবিক রক্তকণিকার কাজ ব্যাহত করে, ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি রক্ত, হাড় ও অন্যান্য অঙ্গকে আক্রান্ত করে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
ব্লাড ক্যান্সারের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হলো অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শরীরের অজানা দুর্বলতা। এই রোগে অস্থিমজ্জা স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদন করতে পারে না, ফলে লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়। এর ফলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না এবং সামান্য কাজেও প্রচণ্ড অবসাদ লাগে। অনেক সময় বিশ্রাম নিলেও ক্লান্তি দূর হয় না। এমনকি ঘুম থেকে ওঠার পরও শরীর ভারী লাগে ও শক্তি থাকে না। দীর্ঘদিন এমন ক্লান্তি অনুভূত হলে এটি ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।
ঘন ঘন জ্বর ও সংক্রমণ
রক্তে সাদা কণিকার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে শরীর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণে দ্রুত আক্রান্ত হয়। বারবার ঠান্ডা, কাশি বা ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই জ্বর আসে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ধরনের জ্বর সাধারণ ওষুধে সহজে সারে না। যদি ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া বা জ্বর দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সহজে রক্তপাত ও আঘাতের দাগ
ব্লাড ক্যান্সারে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শরীরের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে সামান্য আঘাত বা কাটা লাগলেও রক্তপাত বন্ধ হতে সময় লাগে। নাক থেকে বা মাড়ি থেকে হঠাৎ রক্ত পড়া শুরু হতে পারে। ত্বকে ছোট ছোট লালচে বা নীলচে দাগ দেখা দেয়, যা সহজে যায় না। এমনকি কোনো আঘাত ছাড়াই শরীরে কালচে দাগ উঠতে পারে। এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি।
রাতের অতিরিক্ত ঘাম ও ওজন কমে যাওয়া
রাতে ঘুমানোর সময় অস্বাভাবিকভাবে ঘাম হওয়া ব্লাড ক্যান্সারের একটি সাধারণ লক্ষণ। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে, যার ফলে অতিরিক্ত ঘাম ঝরে। অনেক সময় জামা-কাপড় ভিজে যায়, এমনকি বিছানাও ভিজে যায়। পাশাপাশি কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যেতে থাকে। ক্ষুধা কমে যায় এবং খাবারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা সাধারণ ব্যাপার হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনগুলো রোগের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা একটি সাধারণ উপসর্গ। রক্তকণিকা তৈরির স্থান অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হলে সেখানে চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে হাড়ে ব্যথা বা গভীর জ্বালাভাব অনুভূত হয়। অনেক সময় এই ব্যথা রাতে বা বিশ্রামের সময় আরও তীব্র হয়। শিশু ও তরুণদের মধ্যে এটি হাঁটু, কোমর বা কাঁধে বেশি দেখা যায়। নিয়মিত বা অজানা কারণে হাড়ে ব্যথা থাকলে তা গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্ট
লোহিত রক্তকণিকা কমে গেলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফলে রোগী প্রায়ই মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও ভারসাম্য হারানোর অভিজ্ঞতা পান। সামান্য পরিশ্রমেও শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কিছু সময় হাঁটাচলা বা সিঁড়ি ভাঙার সময় শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। এটি ব্লাড ক্যান্সারের একটি উপেক্ষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষণ।
ফোলা লিম্ফ নোড, লিভার বা প্লীহা
ব্লাড ক্যান্সারের ফলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যায়। গলার নিচে, বগলে বা কুঁচকির কাছে ছোট গাঁটের মতো ফোলা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় লিভার ও প্লীহা বড় হয়ে পেট ফুলে যায় বা ভারী লাগে। এতে খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায় এবং অল্প খাওয়াতেই পেট ভরে যায়। এসব ফোলা সাধারণত ব্যথাহীন হলেও অস্বাভাবিকভাবে বড় হতে থাকে। এটি রোগের একটি স্পষ্ট প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।
ক্ষুধামন্দা ও বমি ভাব
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে ক্ষুধামন্দা সাধারণ বিষয়। শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষের পরিবর্তন ও টক্সিন জমে যাওয়ায় খাওয়ার রুচি নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় খাবারের গন্ধেও বমি বমি ভাব আসে। অল্প খাওয়াতেই পেট ভরে যায় এবং খাবারের পর অস্বস্তি অনুভূত হয়। দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে ও ওজন দ্রুত কমে যায়। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা গেলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
ত্বকের ফ্যাকাশে ভাব
রক্তে লোহিত কণিকা কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, ফলে ত্বক স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারায়। মুখ, ঠোঁট ও চোখের পাতা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। অনেক সময় ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং ঠান্ডা অনুভূত হয়। এতে মুখে ক্লান্ত ও অসুস্থ চেহারা স্পষ্ট দেখা দেয়। এই লক্ষণকে সাধারণ রক্তস্বল্পতা ভেবে উপেক্ষা করা ভুল। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে কারণ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মনোযোগের অভাব ও মানসিক অবসাদ
রক্তে অক্সিজেন ও পুষ্টির ঘাটতি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা প্রভাবিত করে। ফলে মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয় এবং একাগ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রোগী প্রায়ই বিষণ্ণতা বা মানসিক অবসাদে ভোগেন। দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং সারাক্ষণ উদাসীনতা ভর করে। ঘুমের সমস্যা ও মানসিক চাপও বেড়ে যায়। এসব পরিবর্তনও ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক মানসিক লক্ষণ হতে পারে। ব্লাড ক্যান্সার
See also
ভাত , চিনি ও লবন- এই তিন সাদা বিষ থেকে নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা – রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক খাবারের চার্ট ও টিপস
পেটে চর্বি কমানোর উপায় – দ্রুত ফল পেতে অনুসরণ করুন বিজ্ঞানসম্মত ও নিরাপদ ডায়েট প্ল্যান