বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে অজানা ২০টি তথ্য। যা অনেকেই জানে না

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটি শুনলেই মনে ভেসে ওঠে সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও শিল্পকলার এক অপার ভাণ্ডার। তিনি শুধু একজন কবি নন, ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী-যাঁর হাতে কবিতা, গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস ও চিত্রকলায় সৃষ্টি হয়েছিল এক অনন্য জগৎ। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর গান দুই দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পেয়েছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে একমাত্র নজির। তবুও তাঁর জীবন ও কর্মের অনেক দিক আমাদের কাছে অজানা রয়ে গেছে। তাই এখানে তুলে ধরা হলো “বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” সম্পর্কে অজানা ২০টি তথ্য”।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে অজানা তথ্য

শৈশবের কবি জীবন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র আট বছর বয়সে প্রথম কবিতা লিখেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ দেখা গিয়েছিল। ষোল বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ কবি কাহিনী প্রকাশিত হয়। এত অল্প বয়সে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করা বিরল ঘটনা। পরিবারের উৎসাহে তিনি কবিতা রচনায় মনোযোগী হন। ছোট্ট বয়সেই তাঁর রচনায় যে পরিণত ভাব এসেছে তা সকলকে অবাক করেছিল। তাই শৈশব থেকেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বমানের পরিচয় দিয়েছিল।

অপ্রথাগত শিক্ষার্থী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই প্রচলিত স্কুলে পড়াশোনা করেননি। ছোটবেলায় তিনি টিউটরের কাছে পড়াশোনা করতেন। পিতা তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনার জন্য। তবে তিনি সেখানে পড়াশোনা সম্পূর্ণ না করে ফিরে আসেন। তাঁর শিক্ষাজীবন মূলত স্বশিক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তিনি বই, প্রকৃতি ও মানুষের কাছ থেকে শিখতেন। তাই আজীবন তিনি ছিলেন একজন অপ্রথাগত শিক্ষার্থী।

প্রথম এশীয় নোবেল বিজয়ী

তিনি নোবেল পুরস্কার জয়ী প্রথম এশীয় সাহিত্যিক। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির জন্য তিনি এই সম্মান অর্জন করেন। এতে বাংলা ভাষা বিশ্বমঞ্চে নতুন মর্যাদা লাভ করে। তাঁর কবিতা পশ্চিমা পাঠককেও মুগ্ধ করেছিল। নোবেল জয় বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক করেছে। এশিয়ার প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে তিনি গৌরব অর্জন করেন। তাই তিনি কেবল বাঙালির নয়, বিশ্বমানবতার কবি হয়ে ওঠেন।

দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা

তিনি ভারতের জাতীয় সংগীত জন গণ মন রচনা করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলাও তাঁর লেখা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কৃতিত্ব অন্য কোনো কবির নেই। একই কবির লেখা দুটি দেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছে। এই গানগুলো মানুষের আবেগকে জাগ্রত করেছে। দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম তাঁর সৃষ্টির মূলভিত্তি। এজন্য তাঁকে যথার্থই বিশ্বকবি বলা হয়।

শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতে অনুপ্রেরণা

শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবে রচিত হয়েছিল। সেখানকার কবিরা তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গীত দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাঁর কাব্যিক সুর অন্য জাতির মনকেও ছুঁয়েছিল। তিনি শুধু বাঙালির নন, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রেরণা ছিলেন। তাঁর প্রভাব জাতি ও ভাষার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি প্রকৃত অর্থেই “বিশ্বকবি”।

স্যার উপাধি ত্যাগ

১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে। শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হওয়ার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের দেওয়া “স্যার” উপাধি ত্যাগ করেন। তিনি মনে করেছিলেন রক্তস্নাত ভারতের জন্য এই সম্মান রাখা অসম্মানজনক। তাঁর এই পদক্ষেপ সারা ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। স্বাধীনতাকামী মানুষ এতে অনুপ্রাণিত হয়। একজন কবি হয়েও তিনি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর এই সাহসিকতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

বহুমুখী প্রতিভা

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। তাঁর প্রতিভার বিস্তার ছিল অসীম। তিনি সাহিত্যকে মানবপ্রেম, প্রকৃতি ও বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। সংগীত ও নাটকেও তিনি নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তাই তাঁকে কেবল কবি বলা যায় না। তিনি ছিলেন সর্বজনীন প্রতিভার প্রতীক।

চিত্রকলার নন্দন

জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিত্রকলায় মন দেন। প্রায় দুই হাজার ছবি তিনি এঁকেছিলেন। তাঁর ছবিগুলো ছিল অনন্য ও অভিনব। রঙ ও আকারের খেলায় তাঁর কল্পনার জগৎ ফুটে উঠত। তাঁর শিল্পকর্ম ইউরোপেও প্রদর্শিত হয়েছিল। বার্ধক্যেও তিনি নতুন শিল্পমাধ্যমে সাফল্য দেখিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে তিনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত।

রবীন্দ্রসঙ্গীত

তিনি প্রায় ২,৩০০ গান রচনা করেছিলেন। এগুলো আজ রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে পরিচিত। গানগুলোতে প্রেম, ভক্তি, প্রকৃতি ও দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। প্রতিটি গান গভীর আবেগে ভরা। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণ তাঁর গান। তাঁর গান মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়। এজন্য সঙ্গীতে তাঁর অবদান অপরিসীম।

অটোগ্রাফের জনপ্রিয়তা

তিনি ভারতের প্রথম লেখক যিনি অটোগ্রাফ সংগ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। ভক্তরা তাঁর স্বাক্ষরের জন্য আগ্রহী হতো। এতে বোঝা যায় তাঁর জনপ্রিয়তা কতটা ছিল। তাঁর ভক্ত কেবল বাংলায় নয়, ইউরোপ ও আমেরিকাতেও ছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বৈশ্বিক সাহিত্যিক। তাঁর উপস্থিতি ভক্তদের মাঝে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করেছিল। তাই তিনি বিশ্বসাহিত্যের মহারথী।

শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা

তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে এটি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল মুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা। শিশুদের প্রকৃতির মাঝে শিক্ষা দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এখানে বইয়ের বাইরেও জীবনধর্মী শিক্ষা দেওয়া হতো। শিক্ষার নতুন ধারায় তিনি পথপ্রদর্শক হন। তাঁর শান্তিনিকেতন আজও শিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠান।

গুরুদেব ও গান্ধী

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গান্ধীজি তাঁকে “গুরুদেব” বলে ডাকতেন। তবে রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁদের মাঝে মতপার্থক্য হতো। রবীন্দ্রনাথ অহিংস আন্দোলনের কৌশল নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল অটুট। তাঁদের বন্ধুত্ব ভারতীয় সমাজে অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে। এটি দুই মহামানবের সম্পর্কের নিদর্শন।

বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

তিনি ৬৩ বছর বয়সে প্রথমবার বিমান ভ্রমণ করেছিলেন। এত বয়সে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি রচনায় ফুটে উঠেছে সেই অভিজ্ঞতা। জীবনের শেষ বয়সেও তিনি কৌতূহলী ছিলেন। তিনি সবসময় নতুন কিছু জানতে আগ্রহী হতেন। তাঁর মানসিকতা ছিল মুক্ত ও উদার। এজন্য তিনি চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।

প্রথম ছোটগল্প ভিখারিণী

রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প ভিখারিণী প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। এটি বাংলা ছোটগল্পের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। তিনি বাংলা ছোটগল্পের জনক হিসেবে পরিচিত। তাঁর গল্পে সমাজ বাস্তবতা ফুটে উঠত। মানুষের মনস্তত্ত্ব তিনি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতেন। সমাজ সংস্কারের বার্তাও তাঁর গল্পে থাকত। তাঁর ছোটগল্প চিরকাল সাহিত্য ইতিহাসে অমলিন।

শেক্সপিয়ারের ভক্ত

তিনি শেক্সপিয়ারের বিশাল ভক্ত ছিলেন। শেকসপিয়ারের নাটক বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। এতে পাশ্চাত্যের সাহিত্য বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি তিনি নিজস্ব নাট্যধারা তৈরি করেন। তাঁর নাটকে মানবপ্রেম ও দর্শনের সমন্বয় দেখা যায়। দর্শককে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ছিল তাঁর নাটকে। নাট্যজগতে তিনি নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন।

জাতীয় সংগীতের কৃতিত্ব

তিনি একমাত্র কবি যার লেখা দুটি দেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর সৃষ্টি। এটি তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর গান মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর গান ভূমিকা রেখেছে। জাতির আবেগকে তিনি সঙ্গীতে রূপ দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।

ছোট ঠাকুর

শৈশবে তিনি খুব চুপচাপ ছিলেন। তাঁকে সবাই “ছোট ঠাকুর” বলে ডাকত। পরিবারের অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন আলাদা। তিনি কথা কম বলতেন, চিন্তায় ডুবে থাকতেন। সেই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছিল সৃজনশীল শক্তি। পরবর্তীতে সেই নীরব শিশুই হয়ে ওঠেন বিশ্বকবি। তাই বলা হয়, নীরবতা থেকেই সৃষ্টি হয় মহিমা।

নোবেল পদক চুরি

১৯২০-এর দশকে তাঁর নোবেল পদক চুরি হয়ে যায়। এটি শান্তিনিকেতনের জাদুঘরে রাখা ছিল। এই চুরির ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে নোবেল কর্তৃপক্ষ প্রতিলিপি পদক পাঠায়। এটি ছিল এক দুঃখজনক অধ্যায়। তবে এতে তাঁর নাম আরও আলোচনায় আসে। এই ঘটনা ইতিহাসে বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ আছে।

ব্রিটিশ সাহিত্য পুরস্কার

তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাহিত্য পুরস্কার পান। এতে তাঁর আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। ইউরোপ তাঁকে তাদের সমকক্ষ মনে করেছিল। তিনি শুধু ভারতীয় নন, বৈশ্বিক সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর প্রতিভাকে পশ্চিমারা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে। এর ফলে তিনি বিশ্বমঞ্চে বিশেষ স্থান লাভ করেন। তাঁর অর্জন চিরকাল স্থায়ী হয়ে থাকবে।

শেষ কবিতা

মৃত্যুর আগে তিনি এক অসাধারণ কবিতা লিখেছিলেন। সেখানে মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ীতা ফুটে উঠেছিল। একইসঙ্গে প্রকৃতির অসীম মহিমা ধরা পড়েছিল। তিনি মৃত্যুকে ভয় করেননি, বরং কবিতায় তাকে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শেষ রচনা মৃত্যুকেও অমর করে দেয়। শেষ মুহূর্তেও তাঁর কলম থামেনি। তাই তিনি হয়ে আছেন চিরকাল অমর কবি।

See also

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের অবাক করা অজানা কথা
বিসিএস, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ জ্ঞান
ছেলের শিক্ষকের কাছে দেওয়া আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক চিঠি

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top