সুইজারল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ও সমৃদ্ধ দেশ, যা ঘড়ি, চকোলেট, বরফে ঢাকা পাহাড় আর হ্রদের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। তবে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা তথ্য, যা সাধারণ ভ্রমণপিপাসু বা ইতিহাসপ্রেমীরা জানেন না। নিরপেক্ষ নীতি, বহুভাষিক সংস্কৃতি, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নিরাপদ জীবনযাত্রা সুইজারল্যান্ডকে আলাদা করে তুলেছে। এ দেশকে বলা হয় বিশ্বের সুখী দেশগুলোর একটি, আবার এর অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মানও অনন্য। তাই আজ আমরা জানব সুইজারল্যান্ড সম্পর্কে এমন কিছু অজানা তথ্য, যা আপনার জ্ঞান বাড়াবে এবং দেশটিকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করবে।
সুইজারল্যান্ড সম্পর্কে অজানা তথ্য
সুইজারল্যান্ডের কোনো সরকারি রাজধানী নেই
অনেকেই জানেন না যে সুইজারল্যান্ডের কোনো আনুষ্ঠানিক রাজধানী নেই। বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই একটি করে রাজধানী থাকে, কিন্তু সুইজারল্যান্ডে এ ব্যতিক্রম দেখা যায়। বার্ন শহরকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়, তবে এটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানী ঘোষণা করা হয়নি। জুরিখ, জেনেভা ও বাসেল অনেক বড় শহর হলেও তারাও রাজধানীর মর্যাদা পায়নি। এর ফলে অনেক বিদেশী ভুল করে রাজধানী হিসেবে জুরিখ বা জেনেভাকে ধরে নেয়। এ বিষয়টি সুইজারল্যান্ডকে অন্য দেশ থেকে আলাদা করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মানচিত্রে কোথাও রাজধানী হিসেবে উল্লেখ থাকে না। এটি দেশটির রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও নিরপেক্ষতার প্রতীক। ফলে সুইজারল্যান্ড একটি অদ্ভুত অথচ অনন্য ব্যতিক্রম হয়ে আছে।
সেনাবাহিনী থাকলেও স্থায়ী সৈন্য নেই
সুইজারল্যান্ডের সেনাবাহিনী আছে, কিন্তু কোনো স্থায়ী সৈন্য নেই। প্রতিটি সুইস নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তরুণ বয়সে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কয়েক মাস প্রশিক্ষণ নেয়। প্রশিক্ষণ শেষে সবাই আবার নিজ নিজ জীবনে ফিরে যায়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের ডেকে পাঠানো হয়। এমনকি অনেকের বাড়িতে এখনও অস্ত্র রাখা থাকে জরুরি প্রয়োজনে। এভাবে সাধারণ নাগরিকরাই দেশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। এ কারণে সুইজারল্যান্ডকে বলা হয় “সেনাবাহিনী ছাড়া সেনা-রাষ্ট্র”। এতে বোঝা যায় দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভিন্নধর্মী। বিশ্বে এমন ব্যবস্থা খুব কম দেশেই আছে।
নিরপেক্ষতার দেশ
সুইজারল্যান্ড ১৮১৫ সালের পর থেকে কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধে অংশ নেয়নি। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে তারা নিরপেক্ষ নীতি বজায় রেখেছে। এমনকি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তারা যুদ্ধে জড়ায়নি। এজন্য দেশটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। অনেক আন্তর্জাতিক সংগঠন যেমন রেড ক্রস, জাতিসংঘের বিভিন্ন দপ্তর এখানে রয়েছে। সুইস নিরপেক্ষতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ নীতির কারণে তাদের ভ্রমণকারীরা যেকোনো দেশে সহজে প্রবেশ করতে পারে। অনেক অভিবাসীও এখানে নিরাপদ জীবনযাপন করে। বিশ্বের কাছে সুইজারল্যান্ড শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।
সুইস চকোলেটের খ্যাতি
সুইজারল্যান্ডকে বলা হয় চকোলেটের দেশ। এখানে বিশ্বের সেরা মানের চকোলেট তৈরি হয়। মাথাপিছু গড়ে একজন সুইস নাগরিক প্রতি বছর ১০ কেজির বেশি চকোলেট খায়। ১৮১৯ সালে প্রথমবার সুইজারল্যান্ডে চকোলেট কারখানা স্থাপিত হয়। এখানেই প্রথম দুধ মিশিয়ে চকোলেট তৈরি করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়। সুইস চকোলেটের স্বাদ অনন্য এবং গুণগত মান খুবই উচ্চ। পর্যটকেরা এখানে গিয়ে চকোলেট উপহার হিসেবে নিয়ে আসতে ভুল করেন না। অনেক বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন টোবলারোন, লিন্ডট এখানেই উৎপত্তি হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতিতেও চকোলেট একটি বড় ভূমিকা রাখে। বলা হয়, এখানকার চকোলেট একবার খেলে ভুলা কঠিন।
ঘড়ির দেশ
সুইজারল্যান্ডকে ঘড়ির দেশ বলা হয়। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল একেবারেই অন্য কারণে। ১৬শ শতকে ধর্মীয় কারণে গহনা তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়। তখন কারিগররা বিকল্প হিসেবে হাতঘড়ি ও পকেট ঘড়ি বানানো শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে এই ঘড়ি বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে। বর্তমানে সুইস ঘড়ি বিশ্বে বিলাসিতা ও মানের প্রতীক। রোলেক্স, ওমেগা, ট্যাগ হিউয়ারের মতো ব্র্যান্ড এখানেই জন্ম নেয়। প্রতিটি ঘড়ি নিখুঁতভাবে হাতে তৈরি হয়। এ শিল্প সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে। আজও বিশ্বের সেরা ঘড়ির নাম শুনলেই সুইজারল্যান্ডের নাম আসে সবার আগে।
ব্যাংকিং গোপনীয়তা
সুইজারল্যান্ড তার ব্যাংকিং গোপনীয়তার জন্য বিখ্যাত। এখানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পর গ্রাহকের তথ্য সর্বোচ্চ গোপন রাখা হয়। এমনকি সরকারও সহজে তা জানতে পারে না। অনেক ধনী ব্যক্তি তাদের টাকা নিরাপদে রাখতে সুইস ব্যাংকে জমা রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকেই সম্পদ বাঁচাতে এখানে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কিছু নিয়ম বদলানো হয়েছে। তারপরও সুইস ব্যাংক এখনও নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার প্রতীক। এখানে টাকার নিরাপত্তা এতটাই শক্তিশালী যে এটি একধরনের আস্থা তৈরি করে। এজন্য বলা হয়, টাকা জমাতে চাইলে সুইজারল্যান্ড সেরা জায়গা।
৭০০০টিরও বেশি হ্রদ
সুইজারল্যান্ড একটি হ্রদের দেশ। এখানে প্রায় ৭০০০টিরও বেশি হ্রদ রয়েছে। যে কোনো জায়গা থেকে ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত একটি হ্রদ পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় হ্রদ হলো জেনেভা লেক। এসব হ্রদের পানি এত পরিষ্কার যে সরাসরি পান করা যায়। পর্যটকেরা এই হ্রদ দেখতে প্রচুর ভিড় করেন। অনেক হ্রদ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত, যা ছবির মতো সুন্দর। গ্রীষ্মকালে মানুষ এখানে সাঁতার কাটতে আসে। শীতকালে বরফ জমে যায়, তখন স্কেটিং হয়। সুইজারল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বড় অংশ এই হ্রদগুলোতেই।
বহুভাষার দেশ
সুইজারল্যান্ডে চারটি সরকারি ভাষা আছে। এগুলো হলো জার্মান, ফরাসি, ইতালিয়ান ও রোমানশ। বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভাষা ব্যবহৃত হয়। উত্তর ও মধ্য অঞ্চলে জার্মান বেশি প্রচলিত। পশ্চিমে ফরাসি, দক্ষিণে ইতালিয়ান এবং কিছু ছোট এলাকায় রোমানশ ভাষা বলা হয়। এই বৈচিত্র্য সুইজারল্যান্ডকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাহিত্য আছে। স্কুলগুলোতেও একাধিক ভাষা শেখানো হয়। এজন্য অধিকাংশ সুইস নাগরিক সহজেই দুই বা তিন ভাষা বলতে পারে। ভাষার এ বৈচিত্র্য দেশটিকে আরও অনন্য করেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বিশেষত্ব
সুইজারল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা। এখানে পড়াশোনা প্রায় বিনামূল্যে বা খুবই কম খরচে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান ও ব্যবসা শিক্ষায় এ দেশ অগ্রগামী। অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী এখান থেকে বের হয়েছেন, যেমন আলবার্ট আইনস্টাইন। শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য তারা প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপে গুরুত্ব দেয়। তাই এখানকার স্নাতকরা সহজেই চাকরি পেয়ে যায়। স্কুলগুলোতেও একাধিক ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা মান উন্নয়নে সরকার সর্বদা কঠোর নজরদারি করে। এজন্য সুইজারল্যান্ড জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে।
বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি
সুইজারল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবে ধরা হয়। এখানে অপরাধের হার খুবই কম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দক্ষ ও কঠোর। মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা শক্তিশালী। পর্যটকেরা নির্ভয়ে ভ্রমণ করতে পারে। মহিলারা রাতেও একা বের হতে ভয় পান না। শিশুরা স্বাধীনভাবে বাইরে খেলতে পারে। এমনকি বড় শহরেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দৃঢ়। এই নিরাপত্তা দেশটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। এজন্য অনেকেই এটিকে বসবাসের স্বপ্নের দেশ মনে করে।
বিশ্বের দীর্ঘতম টানেল
সুইজারল্যান্ডে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম রেলওয়ে টানেল “গটহার্ড বেস টানেল”। এটি ২০১৬ সালে চালু হয় এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৭ কিলোমিটার। টানেলটি আল্পস পর্বতের নিচ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ইউরোপের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। টানেল তৈরি করতে প্রায় ১৭ বছর সময় লেগেছিল। এটি তৈরি করতে বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রেল প্রকল্পগুলোর একটি। প্রতিদিন শত শত ট্রেন এখানে চলাচল করে। টানেলের ভেতরে ভ্রমণ করা অনেকের কাছে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সুইস প্রকৌশল দক্ষতার একটি অনন্য উদাহরণ এটি। এজন্য এটিকে আধুনিক বিশ্বের বিস্ময় বলা হয়।
সরাসরি গণভোটের দেশ
সুইজারল্যান্ডে জনগণ সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নিতে পারে। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গণভোট আয়োজন করা হয়। সংসদে কোনো আইন পাশ হলেও জনগণ চাইলে সেটি বাতিল করতে পারে। বছরে বহুবার ছোট বড় গণভোট হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় “সরাসরি গণতন্ত্র”। অন্য দেশে সাধারণত নির্বাচিত প্রতিনিধি আইন তৈরি করে, কিন্তু সুইজারল্যান্ডে জনগণের মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সুইস নাগরিকরা রাজনীতিতে সচেতন ও সক্রিয়। অনেক বিদেশী পর্যবেক্ষক এ ব্যবস্থাকে অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখে। জনগণের হাতে এভাবে ক্ষমতা দেওয়া খুব কম দেশে দেখা যায়। এটাই সুইস গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
বিশ্বের সুখী দেশগুলোর একটি
জাতিসংঘের বিভিন্ন জরিপে সুইজারল্যান্ড প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষ সুখী দেশের তালিকায় আসে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, নিরাপত্তা, কাজের সুযোগ সবই এখানে ভালো। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিষ্কার পরিবেশও মানুষকে মানসিকভাবে সুখী রাখে। এখানকার আয় বিশ্বে অন্যতম বেশি। মানুষ অবসরে ভ্রমণ, খেলা ও পরিবারে সময় কাটাতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় কেউ দারিদ্র্যে পড়ে না। নাগরিকরা একে অপরকে সম্মান করে। এজন্য এখানে জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত উন্নত। সুইজারল্যান্ডকে অনেকেই পৃথিবীর সুখের ঠিকানা বলে মনে করে।
রেড ক্রসের জন্মভূমি
বিশ্ববিখ্যাত মানবিক সংগঠন “রেড ক্রস” এর জন্ম সুইজারল্যান্ডে। ১৮৬৩ সালে জেনেভায় এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হেনরি ডুনান্ট, যিনি যুদ্ধাহত সৈনিকদের সাহায্য করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে এ সংগঠন বিশ্বব্যাপী মানবতার প্রতীক হয়ে ওঠে। আজ রেড ক্রস ১৯০টিরও বেশি দেশে কাজ করছে। দুর্যোগ, যুদ্ধ ও মহামারীতে এ সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুইজারল্যান্ড নিরপেক্ষ দেশ হওয়ায় রেড ক্রসের সদরদপ্তরও এখানেই রাখা হয়েছে। এজন্য সুইজারল্যান্ডকে মানবিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বলা হয়। এই দেশের মানুষও স্বেচ্ছাসেবায় অনেক সক্রিয়। ফলে মানবতার সেবায় সুইজারল্যান্ডের অবদান অনন্য।