অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একসময় যে রোগগুলো সহজে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, আজ সেগুলো চিকিৎসা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যাকটেরিয়া নিজেদের জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ওষুধের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষমতা অর্জন করছে, যাকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। এর ফলে সাধারণ সংক্রমণও জটিল আকার ধারণ করছে এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কারণে মানবস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুতর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। আজ আমরা অ্যান্টিবায়োটিক কি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের রেসিস্ট্যান্সের কারণে আমাদের যে ক্ষতি হচ্ছে সে সম্পর্কে আলোচনা করব।
অ্যান্টিবায়োটিক কি ?
অ্যান্টিবায়োটিক হলো এক ধরনের ওষুধ যা মানুষের শরীরে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে বা তাদের বৃদ্ধি বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ কাজ করে কিন্তু ভাইরাস, ফাঙ্গাস বা পরজীবী সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরী নয়।
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কারণে যে ক্ষতি হয়
সাধারণ রোগের জটিলতা বৃদ্ধি করে
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কারণে আগে যেসব রোগ সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা যেত, এখন সেগুলো চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ সর্দি-জ্বর, কানে ইনফেকশন বা মূত্রনালীর সংক্রমণও জটিল হয়ে যাচ্ছে। ব্যাকটেরিয়া ওষুধের প্রতি প্রতিরোধী হওয়ায় রোগ নিরাময়ের সময় বেড়ে যায়। ফলে রোগী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকে এবং কর্মক্ষমতা হারায়। এতে পরিবারের উপর মানসিক ও আর্থিক চাপ পড়ে। অনেক সময় নতুন সংক্রমণ যুক্ত হয়ে রোগের অবস্থা আরও খারাপ হয়। এ কারণে মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগতে বাধ্য হয়।
মৃত্যুহার হারে বাড়ছে
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের ফলে মৃত্যুহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আগে যেসব সংক্রমণ সহজেই সারানো যেত, এখন সেগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেক সময় রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যু ঘটে। বিশেষ করে দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ যেমন শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হাসপাতালের ইনফেকশনও এই কারণে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। চিকিৎসকরা কার্যকর ওষুধ না পাওয়ায় জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই এটি মানব জীবনের জন্য বড় হুমকি।
সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে
রেসিস্ট্যান্সের কারণে রোগীর সুস্থ হতে বেশি সময় লাগে। যে রোগে আগে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হতো, এখন সেখানে সপ্তাহ বা মাস লেগে যায়। এর ফলে রোগীর শারীরিক দুর্বলতা বাড়ে। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার কারণে মানসিক চাপও তৈরি হয়। পরিবারকে বাড়তি খরচ বহন করতে হয়। হাসপাতালের শয্যা দখল হয়ে যাওয়ায় নতুন রোগীদের জায়গা সংকট দেখা দেয়। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চাপ বৃদ্ধি পায়। এতে সামগ্রিকভাবে সমাজের ক্ষতি হয়।
চিকিৎসা ব্যয়ের বেশি হয়
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স রোগীর চিকিৎসা ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা, নতুন নতুন টেস্ট করা এবং শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করায় খরচ বাড়ে। অনেক পরিবারকে ঋণ নিতে হয় বা সম্পদ বিক্রি করতে হয়। দরিদ্র মানুষের পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে তারা মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়। ফলস্বরূপ রোগের জটিলতা আরও বেড়ে যায়। সামগ্রিকভাবে একটি দেশের অর্থনীতির উপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
জটিল অস্ত্রোপচারে ঝুঁকি বাড়ে
বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু রেসিস্ট্যান্সের কারণে অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। এতে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকরা জটিল সার্জারি করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। অনেক সময় রোগীকে অস্ত্রোপচার থেকে বিরত থাকতে হয়। বিশেষ করে অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা হৃদপিণ্ডের সার্জারির মতো কাজে এই ঝুঁকি মারাত্মক। এ কারণে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। সমাজের জন্য এটি এক বড় ক্ষতি।
ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়
ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নেওয়ার ফলে রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তখন সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত জরুরি হয়। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স থাকায় ক্যান্সার রোগীদের সংক্রমণ সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। এতে ক্যান্সার চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকরা সীমিত বিকল্প ব্যবস্থার মুখে পড়ে যান। রোগীর মানসিক চাপও অনেক বেড়ে যায়। এটি ক্যান্সার চিকিৎসার অগ্রগতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
নবজাতক ও শিশুদের ঝুঁকি বেড়ে যায়
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স শিশুদের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। জন্মের পর নবজাতকরা খুব সহজেই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। আগে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেত। কিন্তু এখন অনেক সময় ওষুধ কার্যকর হয় না। এর ফলে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। একই সঙ্গে শিশুদের দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি কারণ
প্রাণিসম্পদে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার রেসিস্ট্যান্স তৈরি করছে। এসব প্রাণীর মাংস ও দুধের মাধ্যমে রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কৃষি উৎপাদনেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। গবাদিপশুর মৃত্যু ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। খাদ্যের দাম বাড়ছে এবং জনগণ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সমাজে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে।
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি হয়
রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া এক ব্যক্তির শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবার, সমাজ এমনকি পুরো দেশেও সংক্রমণ বিস্তার লাভ করে। একবার যদি কোনো এলাকায় রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়। হাসপাতালগুলো এ ধরনের সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। ভ্রমণের মাধ্যমে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এতে মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে মানবসভ্যতা মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ে।
চিকিৎসকগণ আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করেন
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। রোগীকে কার্যকর ওষুধ দিতে গিয়ে তারা বিপাকে পড়েন। অনেক সময় রোগীকে পরীক্ষামূলকভাবে একের পর এক ওষুধ দিতে হয়। এতে রোগীর ভোগান্তি বাড়ে। চিকিৎসকরা আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করেন। নতুন রোগ নিরাময়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ে
রেসিস্ট্যান্স বাড়ার কারণে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু নতুন ওষুধ আবিষ্কার করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। সব দেশেই এর গবেষণা করা সম্ভব হয় না। ফলে কার্যকর ওষুধের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। রোগীরা সীমিত বিকল্পের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক সময় পুরনো ওষুধও কাজ করে না। এতে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়ছে। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ধীর করছে।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি। রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উন্নত ও অনুন্নত উভয় দেশেই এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগছে। ভবিষ্যতে অনেক সাধারণ সংক্রমণও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ফলে মানবসভ্যতা অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক কি অ্যান্টিবায়োটিক কি
See also
পেটে চর্বি কমানোর উপায় – দ্রুত ফল পেতে অনুসরণ করুন বিজ্ঞানসম্মত ও নিরাপদ ডায়েট প্ল্যান
মাশরুমের উপকারিতা ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ১৫টি স্বাস্থ্য সুবিধা
নিম পাতার উপকারিতা – সুস্থ জীবনযাপনের প্রাকৃতিক রহস্য