WHO ও ILO গবেষণা: দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি

আজকের যুগে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া বা বাড়তি আয়ের আশায় দিন-রাত এক করে কাজ করাটা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ভাবেন, যত বেশি কাজ করা যাবে, জীবনে তত দ্রুত সফল হওয়া যাবে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র একটি যৌথ গবেষণায় এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। গবেষকদের মতে, দিনে ৮ ঘণ্টা বেশি কাজ করা মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত খাটুনি কোনো বাহাদুরি নয়, বরং এটি আপনার অজান্তেই আপনার জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

WHO ও ILO-র ভয়ংকর রিপোর্টে যা বলা আছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labour Organization) এক বিশাল গবেষণায় দেখেছে যে, যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন, তাদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা মানে হলো-সপ্তাহে ৫ দিন কাজ করলে দৈনিক ১১ ঘণ্টা করে, আর সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করলে দৈনিক প্রায় ৯-১০ ঘণ্টা করে।

রিপোর্টের মূল তথ্য এক নজরে:

  • স্ট্রোকের ঝুঁকি: সপ্তাহে স্বাভাবিক ৩৫-৪০ ঘণ্টা কাজ করা মানুষের তুলনায় অতিরিক্ত পরিশ্রমীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫% বেশি
  • হৃদরোগে মৃত্যু ঝুঁকি: অতিরিক্ত কাজ হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায় ১৭%
  • মৃত্যুর পরিসংখ্যান: মাত্র এক বছরে সারা বিশ্বে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ শুধুমাত্র অতিরিক্ত কাজের চাপে মারা গেছেন।
  • বিভাজন: এদের মধ্যে ৩ লাখ ৯৮ হাজার জন মারা গেছেন স্ট্রোকে এবং ৩ লাখ ৪৭ হাজার জন হৃদরোগে।
  • সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত: ৪৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী পুরুষরা এই ঝুঁকির প্রধান শিকার।

অতিরিক্ত কাজ কেন শরীরকে ভেতর থেকে নষ্ট করে?

বিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত কাজ করা মানে শরীরকে তার সীমার বাইরে ব্যবহার করা। এটি মূলত দুইভাবে আমাদের ক্ষতি করে:

১. বায়োলজিক্যাল স্ট্রেস (শরীরের ভেতরের চাপ):

  • কাজের চাপে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোন বেড়ে যায়।
  • এগুলো উচ্চ রক্তচাপ তৈরি করে এবং ধমনীর ভেতরে চর্বি জমাতে সাহায্য করে।
  • দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে রক্তনালি শক্ত হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, যা থেকে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হয়।

২. অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন:

  • শারীরিক স্থবিরতা: দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা পায়ের রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয়।
  • ঘুমের অভাব: কাজ শেষ করতে গিয়ে মানুষ ঘুমের সময় কমিয়ে দেয়, ফলে হার্ট বিশ্রামের সুযোগ পায় না।
  • ভুল খাদ্যাভ্যাস: ব্যস্ততার কারণে বাইরের ফাস্ট ফুড বা তৈলাক্ত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে।
  • নেতিবাচক আসক্তি: ক্লান্তি দূর করতে অনেকে চা-কফি, সিগারেট বা অ্যালকোহলের ওপর নির্ভর করেন, যা শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি করে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন?

সবাই সমান ঝুঁকিতে না থাকলেও নিচের তিনটি গ্রুপ সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে:

  • মাঝবয়সী পুরুষ (৪৫-৭৪ বছর): দীর্ঘদিনের কাজের চাপের প্রভাব এই বয়সে এসে প্রকট হয়।
  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কর্মী: বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের মতো দেশে অতিরিক্ত কাজ করাকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হয়, ফলে এখানে মৃত্যুর হার বেশি।
  • উচ্চ চাপের পেশা: আইটি প্রফেশনাল, ডাক্তার, কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ এবং সাংবাদিকদের কাজের সময় নির্দিষ্ট না থাকায় তারা চরম ঝুঁকির মুখে থাকেন।

মরণফাঁদ থেকে বাঁচার ১০টি কার্যকর উপায়

চাকরি ছাড়া সম্ভব নয়, তবে অভ্যাসে পরিবর্তন এনে জীবন রক্ষা করা সম্ভব। মেনে চলুন এই টিপসগুলো:

  • অফিসে ঢোকার সময়ই ঠিক করুন আপনি কখন বের হবেন। প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টা কাজের পর ল্যাপটপ বন্ধ করার মানসিকতা গড়ে তুলুন।
  • প্রতি ৪৫ মিনিট পর পর সিট থেকে উঠে ৫ মিনিটের জন্য হাঁটুন বা জানালার বাইরে তাকান।
  • রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সময়টি শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন।
  • লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন বা ফোনের কথা বলার সময় পায়চারি করুন।
  • সারা দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন এবং ক্লান্তি দূর করতে ভাজাপোড়া না খেয়ে বাদাম বা ফল খান।
  • দিনে অন্তত ১০ মিনিট বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার (Deep Breathing) ব্যায়াম করুন।
  • ৩৫ বছর বয়স পার হলে বছরে অন্তত একবার ব্লাড প্রেশার, সুগার এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করান।
  • নিজের ক্ষমতার বাইরের প্রজেক্ট বা অপ্রয়োজনীয় মিটিং বিনয়ের সাথে এড়িয়ে চলুন।
  • একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর অফিসের ফোন বা মেইল দেখা বন্ধ করুন।
  • বাগান করা, গান শোনা বা বই পড়ার মতো শখগুলো মানসিক চাপ কমিয়ে আয়ু বাড়াতে সাহায্য করে।

পরামর্শ

মনে রাখবেন, অফিসে আপনার বিকল্প একদিন না একদিন ঠিকই তৈরি হবে, কিন্তু পরিবারের কাছে আপনার কোনো বিকল্প নেই। সত্যিকারের সাফল্য শুধু অর্থ বা পদোন্নতিতে নয়, বরং সুস্থ শরীরে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তাই কাজের পাশাপাশি নিজের স্বাস্থ্য ও পরিবারের জন্যও সময় দিন-কারণ শরীর সুস্থ থাকলেই জীবন ও কাজ দুটোই সুন্দরভাবে এগিয়ে যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top