ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা কোনো সতর্কতা ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই এই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ও শান্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। ঘরে বা বাইরে-যেখানেই থাকুন, নিজেকে নিরাপদ স্থানে রাখার জন্য উপযুক্ত করণীয় জানা থাকলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করলে দুর্ঘটনা বাড়তে পারে, তাই স্থির মনোভাবই এখানে সবচেয়ে বড় সহায়ক। পরিবার ও আশপাশের মানুষকে দ্রুত সতর্ক করা এবং নিরাপদ অবস্থানে যেতে সাহায্য করাও দায়িত্বের অংশ। সচেতনতা ও প্রস্তুতিই ভূমিকম্পের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। আজ আমরা ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে জানব।
ভূমিকম্পের সময় করণীয়
শান্ত থাকার চেষ্টা করুন
ভূমিকম্প শুরু হলে প্রথম কাজ হলো নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখা। আতঙ্কিত হলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন। আশপাশের মানুষকেও শান্ত থাকতে উৎসাহিত করুন। ভীত হলে হঠাৎ দৌড়ানো বা ভুল দিকে ছুটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মাথা ঠান্ডা রেখে নিরাপদ জায়গা চিহ্নিত করা জরুরি। মনে রাখুন, কয়েক সেকেন্ডের বিবেচনাই জীবন বাঁচাতে পারে। নিজের মনকে স্থির রাখলে পরবর্তী করণীয়গুলো সঠিকভাবে মেনে চলা সম্ভব হবে।
শক্ত ও নিরাপদ আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন
ভূমিকম্পের সময় ভারী আসবাব, টেবিল বা মজবুত বস্তুর নিচে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ উপর থেকে পড়া দরজা, জানালা বা ছাদের অংশ এভাবে আপনার শরীরকে আঘাত করতে পারে না। আশ্রয় নেওয়ার সময় মাথা ও ঘাড় দু’হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন। আসবাবের পা শক্তভাবে ধরে রাখলে দুললেও টেবিলের নিচে নিরাপদ থাকা যায়। সম্ভব হলে দেয়ালসংলগ্ন আসবাব বেছে নিন। খোলা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকলে আলাদা ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই দ্রুত কোনো মজবুত কিছুর নিচে ঢুকে পড়া উচিত। এই কৌশল জীবনরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত।
জানালা, দরজা ও কাঁচের জিনিস থেকে দূরে থাকুন
ভূমিকম্পের সময় কাঁচ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। জানালা বা আলমারির কাঁচ ভেঙে তীক্ষ্ণ টুকরা ছড়িয়ে বড় ধরনের আঘাত লাগতে পারে। তাই শুরুতেই এসব জিনিস থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। দরজার পাশে দাঁড়ানোও বিপজ্জনক, কারণ দরজার ফ্রেম ভেঙে পড়তে পারে। কাঁচের তাক বা শোকেসের কাছেও থাকা উচিত নয়। শক্ত দেয়ালের পাশে নিচু হয়ে আশ্রয় নিন। এভাবে আপনি ভাঙ্গা কাঁচের আঘাত থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন। সামান্য সতর্কতা বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।
এলিভেটর বা লিফট ব্যবহার করবেন না
ভূমিকম্প চলাকালে লিফট ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে লিফট থেমে যেতে পারে। এতে ভেতরে আটকা পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি লিফটের শ্যাফট নড়ে গিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সিঁড়ি ব্যবহার করাই নিরাপদ পন্থা। তবে তাও ভূমিকম্পের সময় নয়—কম্পন থামার পরই নড়াচড়া করা উচিত। লিফটের দরজার আশপাশে দাঁড়ানো থেকেও বিরত থাকুন। আগেই ভবনের লোকজনকে লিফট ব্যবহার না করার ব্যাপারে সাবধান করলে সবাই নিরাপদ থাকতে পারে।
গ্যাসের চুলা, বৈদ্যুতিক সুইচ ও আগুনের উৎস বন্ধ করুন
ভূমিকম্পের সময় ঘরে গ্যাস লাইন বা বৈদ্যুতিক সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে আগুন লাগা বা বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কম্পন থামার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চুলা বন্ধ করা জরুরি। বৈদ্যুতিক সুইচও অযথা স্পর্শ করা উচিত নয়। যদি আগুন দেখা যায়, দ্রুত পরিবারকে সতর্ক করুন। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঘরে আগুনের উৎস কোথায় তা সবাইকে আগে থেকেই জানানো ভালো। সচেতনতা ও সময়মতো ব্যবস্থা আপনাকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখতে পারে।
মাথা ও ঘাড় রক্ষা করুন
ভূমিকম্পের সময় মাথা ও ঘাড় মানুষের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। কেননা উপর থেকে পড়া যে কোনো জিনিস প্রথমেই মাথা বা ঘাড়ে আঘাত করতে পারে। তাই হাত দিয়ে শক্তভাবে মাথা ঢেকে রাখুন। ব্যাগ, বালিশ বা বই থাকলে মাথার ওপর রাখুন। নিচু হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা ক্ষতির সম্ভাবনা কমায়। দেয়ালের পাশে গোল হয়ে বসলে স্থিতিশীলতা বেশি থাকে। নিজের সঙ্গে আশেপাশের মানুষকেও একইভাবে নিরাপদ ভঙ্গিতে বসতে বলুন। এই কয়েক সেকেন্ডের সতর্কতা বড় আঘাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।
দরজা বা সিঁড়ির দিকে দৌড়াবেন না
ভূমিকম্পের সময় দৌড়াতে গেলে ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া বা ভাঙা জিনিসের ওপর পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সিঁড়ি ভূমিকম্পের সময় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সিঁড়ির কাঠামো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কম্পন থামার আগ পর্যন্ত স্থানে অবস্থান করাই ভালো। দরজার নিচে দাঁড়ানো নিরাপদ নয়—এটা অনেকের ভুল ধারণা। বরং শক্ত দেয়ালের পাশে আশ্রয় নেওয়া শ্রেয়। দৌড়াদৌড়ি করলে অন্যদেরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাই স্থির থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
ঘরের ভারী জিনিসপত্র থেকে দূরে থাকুন
আলমারি, ফ্রিজ, বুকশেলফ বা বড় ফুলদানি ভূমিকম্পে সহজেই পড়ে যেতে পারে। এসব ভারী জিনিস কাছে থাকলে মারাত্মক আঘাত লাগতে পারে। তাই দ্রুত এসব থেকে দূরে সরে যান। ভারী জিনিসের নিচে বা সামনে কখনোই দাঁড়াবেন না। ভবনের যেসব অংশে ঝুলন্ত পাখা বা লাইট রয়েছে তার থেকেও দূরত্ব বজায় রাখুন। নিরাপদ কোণে অবস্থান করাই উত্তম। পরিবারের সদস্যদেরও ভারী আসবাবের আশপাশ থেকে সরে যেতে বলুন। এভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় চলে যান
যদি ভূমিকম্পের সময় রাস্তায় বা বাইরে থাকেন, তাহলে খোলা জায়গা সবচেয়ে নিরাপদ। ভবনের দেয়াল বা বারান্দা থেকে ইট-পাথর পড়ে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। বিদ্যুতের খুঁটি বা তার থেকেও দূরে যান। গাড়ি চালিয়ে থাকলে ধীরে রাস্তার পাশে থামুন। সেতু, উড়ালপুল বা বিল্ডিংয়ের গেটের নিচে থাকা উচিত নয়। মানুষ বেশি জড়ো হয় এমন জায়গা এড়িয়ে চলুন। খোলা মাঠ বা ফাঁকা জায়গায় থাকলে আহত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। শান্তভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
মোবাইলের আলো ব্যবহার করুন কিন্তু নেটওয়ার্ক কম ব্যয় করুন
ভূমিকম্পের সময়ে বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, তাই মোবাইলের টর্চ কাজে লাগে। তবে ব্যাটারি কমে গেলে জরুরি যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আলো প্রয়োজন হলে ব্যবহার করুন, কিন্তু অযথা ফোনে কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। জরুরি তথ্য পাওয়ার জন্য মোবাইল সহায়ক হলেও অতিরিক্ত ব্যবহার সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সিগন্যাল দিতে ছোট বার্তা পাঠাতে পারেন। জরুরি নম্বর সেভ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ব্যাটারি সংরক্ষণ করা বিপদকালীন মুহূর্তে আপনাকে বড় সুবিধা দেবে।
ছোট বাচ্চা, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের আগে নিরাপদে রাখুন
দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে শিশু, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। তাই তাদের আগে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া দায়িত্বের কাজ। তাদের শান্ত রাখতে কথায় সহায়তা করুন। বাচ্চাদের মাথা ঢেকে রাখুন এবং কাছে রাখুন। বৃদ্ধরা দ্রুত নড়াচড়া করতে না পারলে পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা করুন। প্রতিবন্ধী কেউ থাকলে তাকে আগেই নিরাপদ অবস্থানে রাখুন। পরিবারের সবাইকে নিরাপদ রাখতে সহযোগিতা সবচেয়ে জরুরি। একসঙ্গে থাকলে সবার ভয় কমে যায় এবং পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হয়।
কম্পন থামার পর দ্রুত নিরাপদ স্থানে যান
ভূমিকম্প থেমে গেলে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন। বাড়ির দেয়াল বা ছাদের ক্ষতি হয়েছে কি না নিশ্চিত হোন। ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন। লিফট ব্যবহার করবেন না। ভবনের বাইরে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ান। আফটারশকের সম্ভাবনা থাকায় আবার আশ্রয় প্রস্তুত রাখুন। প্রয়োজন হলে জরুরি সেবায় ফোন করুন। নিজে নিরাপদ হওয়ার পর অন্যদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসুন। ভূমিকম্পের সময় করণীয় ভূমিকম্পের সময় করণীয়
See also
AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কে যেসব তথ্য দিলেই হতে পারে আপনার বিপদ
মারাত্মক বিপদ থেকে বাঁচতে হেডফোন যেভাবে ব্যবহার করবেন
যে ৮ লক্ষণে বুঝবেন চশমা বদল করার সময় হয়েছে