আমরা সবাই গল্প শুনতে ভালোবাসি, বিশেষ করে যখন সেই গল্পে থাকে হাসির ঝলক আর জীবনের গভীর শিক্ষা। অনেক সময় ছোট্ট একটি ঘটনা আমাদের এত বড় শিক্ষা দিয়ে যায়, যা কোনো বইয়ের দীর্ঘ অধ্যায় থেকেও পাওয়া যায় না। মজার গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো-এগুলো সহজ ভাষায় কঠিন সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরে। কখনো কোনো বোকামি আমাদের বুদ্ধিমান করে তোলে, কখনো কোনো সাধারণ মানুষ অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করে। জীবনের ভুল, ব্যর্থতা, হাস্যকর পরিস্থিতি কিংবা হঠাৎ পাওয়া উপলব্ধিই হয়ে ওঠে শিক্ষার সেরা মাধ্যম। এমন গল্প পড়লে আমরা শুধু আনন্দ পাই না, নিজের জীবনকেও নতুনভাবে ভাবতে শিখি। এই লেখায় থাকছে শিক্ষণীয় ১০টি মজার মজার গল্প, যা আপনাকে সত্যিই অবাক করবে এবং একই সঙ্গে হৃদয়ে গেঁথে দেবে মূল্যবান বার্তা। প্রস্তুত তো? তাহলে চলুন, শুরু করা যাক অনুপ্রেরণা আর বিস্ময়ে ভরা এই গল্পযাত্রা।
মজার মজার গল্প
গল্প ১: শেষের চিঠি যে পৌঁছাল ৭২ বছর পরে
মানুষের জীবনে সময়ের মূল্য কতখানি? একটি চিঠি তার প্রেরকের হাত ছেড়ে যখন ঠিকানার সন্ধানে বের হয়, তখন তার গন্তব্যে পৌঁছাতে কতক্ষণ সময় লাগে? সাধারণত কয়েক দিন। কিন্তু একটি চিঠির জন্য সেই যাত্রা শেষ হতে লেগেছিল প্রায় ৭২ বছর। এটি নিছক একটি ডাকবিভাগের গাফিলতির গল্প নয়; এটি সময়, স্মৃতি এবং এক মুহূর্তের আবেগকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য উপাখ্যান ।
১৯৫৩ সাল। তরুণ অ্যালান বল সবেমাত্র পৌরুষে পা দিয়েছেন। ইলিনয়ের অটোয়া শহর থেকে ট্রেনে চেপে তিনি রওনা হয়েছেন নিউইয়র্কের পথে। তার গন্তব্য পুয়ের্তো রিকো, সেখানে তার আন্টি মেরির সঙ্গে গ্রীষ্মকাল কাটাবেন। সে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হবে তার জন্য—প্রথম বিমান ভ্রমণ, নতুন ভাষা, অচেনা মানুষ। কিন্তু নিউইয়র্কে বিমান ধরার আগে তার হাতে কিছুটা সময় ছিল। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছান তত্কালীন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক স্থাপত্যকীর্তি, জাতিসংঘের সদর দপ্তর “সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং”-এর সামনে। ভবনটির একটি পোস্টকার্ড কিনে তিনি দ্রুত কিছু কথা লিখলেন—ঠিকানায় বাবা-মা’কে জানালেন তিনি নিরাপদে নিউইয়র্ক পৌঁছেছেন। পোস্টকার্ডের গায়ে একটি দুই সেন্টের ডাকটিকিট আটকে তিনি তা মেইল বক্সে ফেলে দিলেন। তারপর চলে গেলেন পুয়ের্তো রিকোর উদ্দেশ্যে।
কিন্তু সেই পোস্টকার্ড কখনোই অটোয়া শহরের রেভারেন্ড এফ. ই. বল এবং তার পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে, সম্ভবত জাতিসংঘের ডাকঘরের কোনো তাকে বা ফাইলিংয়ের ভুলে, পোস্টকার্ডটি হারিয়ে যায় প্রবহমান সময়ের গর্ভে। সাত দশক পেরিয়ে যায়। ছোট্ট অ্যালান বড় হন, কৈশোর পেরিয়ে যৌবন, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে পা দেন। তিনি ড. অ্যালান বলে পরিচিত হন। জীবন অনেক গল্প জমায়, কিন্তু সেই হারানো পোস্টকার্ডের কথা হয়তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে, হঠাৎ করেই পোস্টকার্ডটি আত্মপ্রকাশ করে ইলিনয়ের অটোয়া শহরের পোস্ট অফিসে। ১৯৫৩ সালের ১৭ জুনের পোস্টমার্ক এখনও স্পষ্ট। পোস্টমাস্টার মার্ক থম্পসন বিস্মিত হয়ে যান। ঠিকানা ছিল রেভারেন্ড এফ. ই. বলের, কিন্তু তারা তো আর ওই ঠিকানায় থাকেন না। নিয়ম অনুযায়ী, এমন “অপ্রাপ্য” ডাক ফেরত পাঠানোর কথা। কিন্তু মার্কের মনটা কাঁদল। ৭২ বছর পর হারিয়ে যাওয়া একটি চিঠি যদি কাউকে না পৌঁছায়, তবে তা কি ডাক বিভাগের ব্যর্থতা নয়? তিনি ঠিক করলেন, চিঠিটিকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতেই হবে।
মার্ক স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি ছোট খবর দিলেন। সেই খবর চোখে পড়ল টেরি কার্বনের। অবসরপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি বর্তমানে বংশলতিকা বিষয়ক গবেষক। গোটা ঘটনাটি তার কাছে এক ধাঁধাঁর মতো মনে হলো। তিনি নিজের জিনিয়ালজি গ্রুপ ও স্থানীয় গ্রন্থাগারের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নামলেন খোঁজে। সংবাদপত্রের পুরোনো ফাইল ঘেঁটে, বিভিন্ন তথ্যের সূত্র ধরে তারা আবিষ্কার করলেন, “অ্যালান” নামের সেই ব্যক্তি এখন আইডাহোর স্যান্ডপয়েন্টে বসবাস করছেন। তার বয়স এখন ৮৮ বছর।
টেরি এবং সাংবাদিক টম কলিন্স যখন ফোন করে ৮৮ বছরের অ্যালানকে জানালেন যে, ১৯৫৩ সালে লেখা তার একটি পোস্টকার্ড উদ্ধার হয়েছে, তখন তিনি হাসিতে ভেঙে পড়েন। “প্রথমে তো আমি শুধু হেসেই যাচ্ছিলাম,” তিনি বলেন, “এটা এতটাই অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত ছিল।” পোস্টকার্ডটি যখন অবশেষে তার হাতে পৌঁছায়, স্যান্ডপয়েন্টের ডাকপিয়ন হাসিমুখে বলে, “দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত।”
৭২ বছর পরে ফিরে পাওয়া সেই পোস্টকার্ডের লেখা ছিল সহজ ও সাদামাটা—”আমি নিউইয়র্ক পর্যন্ত এসে পৌঁছেছি।” কিন্তু এই সহজ বাক্যটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়ের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা, এক কিশোরের প্রথম যাত্রার স্মৃতি, এবং কয়েকজন অপরিচিত মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প। এটি যেন জীবনের এক মায়াবী ছোঁয়া, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু কিছু বার্তা কখনো শেষ হয় না; তারা কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে ।
গল্প ২: রাজকন্যা বানাতে বাবার ‘দেশ’ জয়
বাবা তার মেয়েকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস দিতে চান। কারও বাবা দেন পুতুল, কারও দেন বাড়ি, কারও দেন হীরের গয়না। কিন্তু ভার্জিনিয়ার এক বাবার মনস্থির করলেন, তিনি তার মেয়েকে দেবেন একটি গোটা দেশ, আর তাকে বানাবেন সত্যিকারের রাজকন্যা। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এটি সত্যি ঘটনা ।
২০১৪ সাল। জেরেমিয়া হিটন নামের এক খনিশ্রমিক, যিনি পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি খাতে কাজ করতেন, তার ৭ বছর বয়সী মেয়ে এমিলির একটি স্বপ্ন ছিল—সে হতে চায় রাজকন্যা। বাবা জেরেমিয়া চেয়েছিলেন মেয়ের স্বপ্নপূরণ করতে। পৃথিবীর মানচিত্র খুলে তিনি খুঁজতে লাগলেন এমন এক জমি, যা কারও দখলে নেই। কারণ কোনো দেশের অংশ না হলে, সেখানে নিজের দেশ প্রতিষ্ঠা করা যায়! বিস্ময়কর হলেও সত্যি, মিশর ও সুদানের সীমান্তে ২,০৬০ বর্গকিলোমিটারের একটি অনাবাদি, মরুভূমি-ঘেরা জমি আছে, যার নাম “বির তাওয়িল”। আফ্রিকার এই অঞ্চলটিকে কোনো দেশই নিজের বলে দাবি করে না। ১৯০২ সালে ব্রিটিশরা সীমান্ত নির্ধারণের সময় মিশরকে দেয় নীল নদ, আর সুদানকে দেয় ভূমি। কিন্তু বির তাওয়িলের অবস্থান এমন যে, কায়রো ও খার্তুম—কেউই এই অনুর্বর মাটির টুকরো নিজেদের বলে স্বীকার করতে রাজি নয় ।
জেরেমিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, এটাই তার লক্ষ্য। তিনি পরিবারকে নিয়ে রওনা হলেন মিশরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। উটের পিঠে চড়ে, স্থানীয় বেদুইন গাইডের সাহায্যে তিনি পৌঁছালেন বির তাওয়িলে। সেখানে গিয়ে তিনি একটি পতাকা পুঁতে দিলেন। পতাকার রং ছিল নীল, যাতে লেখা ছিল “কিংডম অফ নর্থ সুদান” এবং চারটি তারা। একটি তারকা ছিল পরিবারের চার সদস্যের জন্য, আর বাকি তিনটি ছিল তাদের তিনটি সন্তানের জন্য। একটি কৃত্রিম ঘোষণাপত্র তৈরি করে তিনি সেই জমিকে “হেইমেট জেমস” নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে ঘোষণা দিলেন এবং নিজের মেয়ে এমিলিকে করলেন রাজকন্যা ।
ঘটনাটি বিশ্বমিডিয়ায় তোলপাড় ফেলে দেয়। কেউ হেসে উড়িয়ে দেন, কেউ জেরেমিয়াকে পাগল বলেন। কিন্তু জেরেমিয়ার দাবি ছিল, তিনি আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই কাজ করেছেন—যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেছেন, শুধু পতাকা পুঁতলেই রাষ্ট্র হয় না, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাগে। কিন্তু জেরেমিয়ার চেষ্টা সেখানেই থেমে থাকেনি। তিনি একটি সরকারি ওয়েবসাইট খোলেন, দেশের জন্য কৃষি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। তার লক্ষ্য ছিল, একদিন এতটুকু জমিতে ফসল ফলানো, স্কুল তৈরি করা এবং সত্যিই তার মেয়ের জন্য একটি বাসযোগ্য রাজ্য গড়ে তোলা ।
এখন পর্যন্ত “কিংডম অফ নর্থ সুদান” কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু একটি ৭ বছরের মেয়ের মুখের হাসি, তার বাবার এই পাগলামির প্রচেষ্টা কি তাকে সত্যিকারের রাজকন্যার চেয়ে কম কিছু দিয়েছে? হয়তো দেয়নি। গল্পটি আমাদের শেখায়, ভালোবাসার মানুষকে খুশি করার জন্য কখনো কখনো স্বপ্ন দেখারও সীমা থাকে না। আর সেই স্বপ্ন যদি সত্যি করতে হয়, তবে সমুদ্র পেরিয়ে মরুভূমিতেও যেতে হয়-নিজের মেয়ের জন্য এক টুকরো জমি দখল করতে ।
গল্প ৩: একাই একশ, যিনি গড়ে তুললেন ৫৫০ হেক্টর জঙ্গল
একটি গাছ লাগানো মানে কি? সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি শখ, একটি দায়িত্ব, কিংবা পরিবেশ রক্ষার ক্ষুদ্র প্রয়াস। কিন্তু একটি গাছ লাগানো যদি হয়ে ওঠে জীবনের ব্রত, যদি এক একটি চারা রোপণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এক বিরল সবুজ বনভূমি, তখন তা ইতিহাস হয়ে যায়। ভারতের আসামের জাদব পায়েং সেই ইতিহাসের নাম ।
১৯৭৯ সাল। ১৬ বছর বয়সী কিশোর জাদব বাড়ি ফিরছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের চর এলাকা পেরিয়ে সে দেখে, অসংখ্য মৃত সাপ পড়ে আছে বালির চর জুড়ে। প্রচণ্ড বন্যার পরে পানি নেমে গিয়েছে, কিন্তু সাপগুলো রোদে পুড়ে মারা গেছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে সে জানে, বন্যার কারণে গাছপালা নষ্ট হওয়ায় সাপগুলো আশ্রয়হীন হয়ে মরুভূমির মতো এই চরে এসেছিল, কিন্তু সূর্যের তাপে তাদের মৃত্যু হয়। কিশোর জাদবের মনে গভীর দাগ কাটে এই ঘটনা। সে ঠিক করে, এই বালিয়াড়িতে সে গাছ লাগাবে, যাতে জীবজন্তুদের থাকার জায়গা হয় ।
পরের দিন থেকেই শুরু হলো তার মহাযজ্ঞ। বাড়ির কাছ থেকে বাঁশের চারা এনে লাগালেন। স্থানীয় গ্রামবাসী প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিল। এই অনুর্বর চরে কিছুই হবে না, তারা বলল। কিন্তু জাদব থামলেন না। প্রতিদিন স্কুল শেষ করে তিনি বাঁশের চারা নিয়ে চলে যেতেন নদীর ধারে। ধীরে ধীরে বাঁশের চারাগুলো বড় হতে লাগল। তারপর তিনি লাগালেন তুলসী, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল। শুরুতে একা হাতে কাজ করলেও, ধীরে ধীরে আশপাশের গ্রামবাসীরা তার এই পাগলামি দেখে উৎসাহিত হলো। জাদব শুধু গাছ লাগাতেন না, তাদের যত্ন নিতেন, বালির চরে সার দিতেন, বীজ ছড়িয়ে দিতেন ।
চার দশক পেরিয়ে গেছে। আজ জাদবের বয়স ৬০ ছুঁইছুঁই। আর তার হাতে গড়া বনভূমির আয়তন প্রায় ৫৫০ হেক্টর (১,৩৬০ একর)! এটি এখন “মোলাই কাঠোনি” বা “মোলাই বন” নামে পরিচিত। এই বনে এখন রয়েছে বাঘ, গন্ডার, হাতি, হরিণ, শূকর, বানরসহ অসংখ্য প্রজাতির পশুপাখি। এশীয় হাতির এক বিরাট দল নিয়মিত আসে এই বনে ঘাস খেতে। পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে চারপাশ। ব্রহ্মপুত্রের চর এখন সবুজে ভরা এক সমৃদ্ধ বনভূমি ।
জাদব পায়েং এখন “ফরেস্ট ম্যান অফ ইন্ডিয়া” নামে পরিচিত। ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছে। তার জীবনের এই গল্পটি প্রমাণ করে, একক প্রচেষ্টায়ও পৃথিবী বদলে দেওয়া যায়। একটি গাছ, একটি প্রাণ-এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি আজও বন রক্ষা করে চলেছেন। কেবল একটি ঘটনা দেখে তিনি যদি মনস্থির না করতেন, তবে আজ ব্রহ্মপুত্রের এই চর হয়তো মরুভূমিই থেকে যেত। জাদব আমাদের শিক্ষা দেন, প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে আমরা নিজেরাই শুরু করতে পারি, এক মুঠো বীজ হাতে ।
গল্প ৪: ভাগ্য বিপর্যয়-দরজা ঠেকানো সেই পাথরটির দাম ১ লাখ ডলার!
কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, আপনার বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকা একটি সাধারণ পাথর আসলে অমূল্য কোনো ধন হতে পারে? মিশিগানের এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছিল। কিন্তু সেটি যে অমূল্য ধন, তা তিনি জানতেই পারেননি ৩০ বছর ধরে। অদ্ভুত এই গল্পটি সত্যি এবং এটি আমাদের শেখায়, মূল্য কেবল চোখে দেখা যায় না, বরং তা জ্ঞানে ও বিশ্বাসে উপলব্ধি করতে হয় ।
গল্পের নায়ক হলেন এক কৃষক, যার নাম ইতিহাসে তেমন উল্লেখ নেই। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি মিশিগানের এডমোর শহরের কাছে একটি খামার কিনেছিলেন। খামারের একটি শস্যাগারের দরজা সবসময় খোলা থাকত বাতাসে। দরজা ঠেকানোর জন্য তার দরকার ছিল একটা মজবুত কিছু। খামারের মাঠেই তিনি পেয়ে গেলেন একটি বিশাল, ধূসর, অসমান পাথর। সেটি তুলে এনে দরজার গোড়ায় রেখে দিলেন। পাথরটা দেখতে কিছুটা অদ্ভুত ছিল, কিন্তু কৃষকের কাছে তা ছিল শুধুই পাথর। তিনি নাম দিলেন ‘ডোরস্টপ’ বা দরজা ঠেকানোর উপকরণ।
তিন দশক কেটে গেল। সেই পাথর বছরের পর বছর পড়ে রইল শস্যাগারের দরজায়। তার গায়ে পড়ল ধুলো, বৃষ্টির জল, শীতের তুষার, গ্রীষ্মের রোদ। কৃষকের জীবন চলল, সময় বদলাল। অবশেষে ২০১৮ সালে, কৃষক মারা যাওয়ার পর তার জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের নজরে পড়ল অদ্ভুত পাথরটি। কেউ একজন বলল, “এটাকে একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত, দেখি কি পাথর।” তারা সেটি তুলে নিয়ে গেল সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব বিভাগে। ড. মনা সিরবেস্কু পাথরটি পরীক্ষা করে হতবাক হয়ে গেলেন। এটি কোনো সাধারণ পাথর নয়। এটি ছিল ১০ কেজি ওজনের একটি উল্কাপিণ্ড! লোহা আর নিকেলের মিশ্রণে তৈরি এই উল্কাপিণ্ডটি মহাকাশ থেকে এসেছিল। গবেষণায় জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে, ১৯৩০-এর দশকে এটি পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। এই ধরনের উল্কা পৃথিবীতে অত্যন্ত দুর্লভ। মিশিগানের ইতিহাসে এটি ছিল ষষ্ঠ বৃহত্তম আবিষ্কৃত উল্কা ।
পরীক্ষার পর এর মূল্য নির্ধারণ করা হয় অন্তত ১ লাখ ডলার। তিন দশক ধরে যে পাথর দিয়ে একজন কৃষক তার শস্যাগারের দরজা ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, সেটি আসলে মহাকাশের এক টুকরো ইতিহাস! ঘটনাটি জানাজানি হলে উল্কা গবেষক ও সংগ্রাহকদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যায়। ২০২০ সালে এটি নিলামে তোলা হয়। নিলামের প্রত্যাশিত মূল্য ছিল ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ডলার। শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয় আরও বেশি দামে ।
এটি নিছক ভাগ্যের গল্প নয়। এটি বাস্তবের সেই অদ্ভুত দিকটি তুলে ধরে, যেখানে আমরা আমাদের চারপাশের জিনিসের প্রকৃত মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হই। কৃষকের পরিবারের জন্য এটি ছিল এক বিস্ময়কর অর্থপ্রাপ্তি, আর আমাদের জন্য এটি শিক্ষা—চারপাশের জিনিসের দিকে একটু ভালো করে তাকানো দরকার। কারণ জানলার পাশে পড়ে থাকা সেই ধুলোমাখা জিনিসটি হয়তো একদিন প্রমাণ করবে, পৃথিবীর চেয়ে আকাশও কাছের হতে পারে ।
গল্প ৫: মৃত্যুর আগে এক কুকুরের ৬৪ হাজার কিলোমিটারের শেষ ভ্রমণ
আমরা মানুষ আমাদের প্রিয়জনের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে অনেক কিছু করি। কিন্তু আমাদের প্রাণীসঙ্গীদের কী হবে? তাদের ইচ্ছা আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু নিউইয়র্কের এক ব্যক্তি বুঝেছিলেন। তিনি তার কুকুরের শেষ ইচ্ছা পূরণে বেরিয়ে পড়েছিলেন পৃথিবী চষে বেড়াতে। ৬৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার এই গল্প হৃদয় ছুঁয়ে যায় ।
নীল রদ্রিগেজ একজন ডিজে। তার জীবন সঙ্গী ছিল পোহ নামের একটি কুকুর। পোহকে তিনি পেয়েছিলেন ছোট্ট অবস্থায়। তারা দুজন একসঙ্গে বড় হয়েছেন, একসঙ্গে ঘুমিয়েছেন, একসঙ্গে গান শুনেছেন। পোহ ছিল তার জীবনের অন্যতম সেরা বন্ধু। কিন্তু পোহ যখন সাত বছরে পা দিল, তখন তার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ল। চিকিৎসা শুরু হলো, কিন্তু কেমোথেরাপি আর ঔষধে পোহ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ভেট বললেন, তার বেশি দিন নেই।
নীল ভেঙে পড়লেন। কিন্তু তিনি চাইলেন না পোহ হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসকদের হাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করুক। তিনি পোহকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। তারপর একদিন পোহকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর কী ইচ্ছে?” পোহ লেজ নাড়ল। নীল বুঝলেন, পোহ ঘুরতে ভালোবাসে। সমুদ্রে, পাহাড়ে, বনে। নীল সিদ্ধান্ত নিলেন, পোহর বাকি দিনগুলো সে যেন পৃথিবীর সেরা সফর করে কাটায়।
তিনি একটি পুরনো ক্যাম্পার ভ্যান কিনলেন। তাতে পোহর জন্য আলাদা বিছানা বানালেন, জানলা খুলে দিলেন, যাতে বাতাস আসে। শুরু হলো তাদের মহাযত্রা। নিউইয়র্ক থেকে তারা রওনা হলেন পশ্চিমমুখী। পোহকে নিয়ে তিনি ঘুরলেন আমেরিকার ৩৫টি শহর। পোহ সাগরের ঢেউ দেখেছে, মরুভূমির বালি দেখেছে, বনের হরিণ দেখেছে, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখেছে। তাদের এই যাত্রার ছবি তিনি পোস্ট করতেন ইনস্টাগ্রামে। ১২ হাজারের বেশি ফলোয়ার জড়ো হয়েছিল তাদের পৃষ্ঠায়। সবাই পোহর জন্য শুভকামনা জানাত, তার সুস্থতা কামনা করত ।
যাত্রা শেষ হলো ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পোহ আর ফিরল না। নেভাদার মরুভূমিতে, শীতের রাতে, পোহ ঘুমিয়ে পড়েছিল চিরদিনের জন্য। নীলের বুকে ছিল শূন্যতা, কিন্তু মনটা শান্তি পেয়েছিল। তিনি পোহর শেষ ইচ্ছে পূরণ করেছেন। পোহ দেখেছে পৃথিবীর সেরা দৃশ্য, পেয়েছে তার প্রিয় মালিকের শেষ সময়ের সঙ্গ ।
পোহর মৃত্যুর পরও নীল থামেননি। তিনি তার স্মৃতিতে একটি ফাউন্ডেশন খোলেন, যেখানে অসুস্থ প্রাণীদের মালিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়, কীভাবে তাদের শেষ সময়গুলো সার্থক করে তোলা যায়। ৬৪ হাজার কিলোমিটারের এই যাত্রা কেবল একটি পোষা প্রাণীর শেষ ইচ্ছে পূরণের গল্প নয়, এটি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা প্রমাণ করে, প্রাণী-মানুষের সম্পর্ক শুধু মালিক-ভৃত্যের নয়, তা বন্ধুত্বের, আত্মীয়তার ।
গল্প ৬: ১৯০০ সালের এক শ্বাসরুদ্ধকর রহস্যের সমাধান
সময় ১৯৯৫ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিভিন্ন সৈকতে-লংপোর্ট, মারগেট, ওশেন সিটি-একে একে ভেসে আসতে থাকে একটি মানুষের খুলি ও হাড়গোড়। পুলিশ তদন্ত শুরু করে, কিন্তু কোনো ক্লু পায়নি। ক্ষতবিক্ষত দেহাবশেষ থেকে কিছুই বোঝা যায় না। পুলিশ ফাইলে নাম দেওয়া হয় “স্ক্যাটার্ড ম্যান জন ডো”। তিন দশক কেটে যায়। মামলাটি ধীরে ধীরে পুরোনো ফাইলে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু নিউ জার্সির পুলিশ ভোলেনি। আর সেই মামলার সমাধান করতে এগিয়ে এল একদল কলেজ পড়ুয়া ।
২০২৩ সাল। র্যামাপো কলেজের ইনভেস্টিগেটিভ জেনেটিক জিনিয়ালজি সেন্টারের (আইজিজি) শিক্ষার্থীরা হাতে নিল এই রহস্য সমাধানের কাজ। তারা জানত, এটি কোনো সাধারণ খুনের মামলা নয়, কারণ হাড়ের গঠন ও অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে এটি বহু পুরোনো। তারা হাড়ের নমুনা পাঠাল ইন্টারমাউন্টেন ফরেনসিকস নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ডিএনএ পরীক্ষায় সাহায্য করে। সেখান থেকে ডিএনএ আপলোড করা হলো জেনিয়ালজি ওয়েবসাইট জিইডম্যাচ ও ফ্যামিলিট্রিডিএনএ-তে। এরপর শুরু হয় একের পর এক পরিবারের খোঁজ। শিক্ষার্থীরা পুরোনো জাহাজডুবির খবর, আদমশুমারির রেকর্ড, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ঘেঁটে দেখতে লাগল, এই ডিএনএ কার সঙ্গে মিলে যায় ।
অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এল সাফল্য। ডিএনএ মিলে গেল এক পরিবারের সঙ্গে। সেই পরিবারের পূর্বপুরুষ ছিলেন হেনরি গুডসেল নামের ২৯ বছর বয়সী এক সমুদ্রকাপ্তান। ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেল, ১৮৪৪ সালে কানেকটিকাটের নিউ হ্যাভেন থেকে “ওরিয়েন্টাল” নামের একটি ছোট জাহাজ নিয়ে ৬০ টন মার্বেল পাথর বোঝাই করে ফিলাডেলফিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন গুডসেল। কিন্তু ফিলাডেলফিয়া harbour-এ পৌঁছানোর মাত্র এক মাইল আগে, উপকূলের কাছে এসে তার জাহাজে জল ঢোকে। প্রচণ্ড ঢেউ ও ঝড়ে জাহাজটি ডুবে যায়। সঙ্গে থাকা কয়েকজন নাবিক এবং ক্যাপ্টেন গুডসেল সমুদ্রেই হারিয়ে যান। স্থানীয় সংবাদপত্র সে সময় এই ঘটনার খবর ছেপেছিল ।
প্রায় ২০০ বছর আগে ডুবে যাওয়া এক নাবিকের দেহাবশেষ অবশেষে শনাক্ত হলো। নিউ জার্সির পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট প্যাট্রিক কলাহান এক বিবৃতিতে বলেন, “আধুনিক জেনেটিক পরীক্ষা প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা ১৯ শতকের একটি ঘটনার সমাধান করতে পেরেছি। এটা আমাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ, আমরা কত পুরোনো মামলাই না মীমাংসা করতে বদ্ধপরিকর।” র্যামাপো কলেজের আইজিজি সেন্টার ২০২২ সালের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে। এরপর থেকে তারা ৯২টি ঠান্ডা মামলায় সহায়তা করেছে এবং সারা দেশে এক ডজনেরও বেশি মানুষের দেহাবশেষ শনাক্ত করতে পেরেছে ।
এই গল্পটি প্রমাণ করে, সময় যতই পেরিয়ে যাক, সত্য চাপা থাকে না। আর সেই সত্য উদঘাটনে যদি আধুনিক বিজ্ঞান হাতে পায় উদ্যমী তরুণ প্রজন্ম, তবে কত পুরোনো ইতিহাস যে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে! ক্যাপ্টেন গুডসেলের আত্মা আজ শান্তি পেয়েছে, কারণ তার পরিবারের বর্তমান সদস্যরা জানেন, তাদের পূর্বপুরুষ কোথায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ।
গল্প ৭: অভিশপ্ত কবর-তিন দিনের মধ্যে হিটলারের আক্রমণ
ইতিহাস অনেক সময় এমন সব রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী থাকে, যা বিজ্ঞান বা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তেমনি একটি গল্প হল ১৯৪১ সালে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ শহরে সংঘটিত একটি ঘটনা। সেখানে তামেরলেন বা তৈমুর লঙ নামে এক ভয়ঙ্কর শাসকের কবর খোলার তিন দিনের মাথায় শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় ।
১৯৪১ সালের জুন মাস। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক মিখাইল গেরাসিমভের নেতৃত্বে একদল গবেষক সমরকন্দের গুর-ই আমির সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছান। তাদের লক্ষ্য ছিল তামেরলেনের কবর খুঁজে বের করা। তামেরলেন ছিলেন ১৪ শতকের এক তুর্কি-মঙ্গোল বীর, যিনি এশিয়া ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চল জয় করেছিলেন। তার শাসন ছিল অত্যন্ত নৃশংস। তার সমাধি চিরকাল রহস্যে ঘেরা ছিল। স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, তৈমুরের কবর খোলা যাবে না। এটি খুললে ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। এমনকি সমাধির গায়ে লেখা ছিল সতর্কবাণী: “কেয়ামতের আগে যে কেউ আমার সমাধি খুলবে, সে আমার চেয়েও ভয়ঙ্কর এক আক্রমণকারীকে মুক্ত করবে” ।
গেরাসিমভ ও তার দল এসব কথা শুনেছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে তা ছিল কুসংস্কার। তারা কাজ শুরু করলেন। ১৯ জুন তারিখে তারা সমাধির মুখ খুললেন এবং ২১ জুন ভেতরে প্রবেশ করলেন। ভেতরে ছিল তামেরলেনের কঙ্কাল। দেখা গেল, তার ডান পায়ের হাঁটু ও কাঁধের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত, যা ইতিহাসের সঙ্গে মিলে যায়-তামেরলেন পঙ্গু ছিলেন। কিন্তু খবর পৌঁছাল মস্কোতে। স্ট্যালিনের নির্দেশে গবেষণা চলল। এর ঠিক তিন দিন পরে, ২২ জুন ১৯৪১ সালে, হিটলারের সেনারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল “অপারেশন বারবারোসা”-র মাধ্যমে। শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব রণাঙ্গনের ভয়াবহ লড়াই। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেল ।
এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াল। অনেক মুসলিম বলতে লাগল, তামেরলেনের অভিশাপ সত্যি হয়েছে। সোভিয়েত সরকার প্রথমে এসব কথা গুরুত্ব দিল না। কিন্তু ১৯৪২ সালের নভেম্বরে, যখন স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ চলছে, তখন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। তারা তামেরলেনের কঙ্কাল পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করল। ইসলামি রীতি অনুযায়ী, মোল্লাদের ডেকে আনা হলো, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হলো এবং তৈমুরকে আবার সমাহিত করা হলো। এই ঘটনার কিছুদিন পরই সোভিয়েত সেনারা স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় ।
এটি কি নিছক কাকতালীয় ঘটনা? নাকি সত্যিই ৬০০ বছরের পুরোনো এক অভিশাপ কাজ করেছিল? বিজ্ঞানীরা একে মানতে চান না, কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, অনেক ঘটনার পেছনে এমন রহস্য লুকানো থাকে, যা আজও ধাঁধায় ফেলে দেয়। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু কিছু রহস্য হয়তো কখনো মীমাংসা হবে না, কিন্তু তা ইতিহাসকে আরও রঙিন করে তোলে ।
গল্প ৮: ৪০০ গুণের অলৌকিক মিল-যে কারণে পৃথিবীতে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়
পৃথিবীর সবচেয়ে চমকপ্রদ দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো সূর্যগ্রহণ। যখন চাঁদ সূর্যের সামনে এসে পড়ে, তখন দিন হয়ে যায় রাত, চারপাশে নেমে আসে অদ্ভুত অন্ধকার। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই ঘটনা কীভাবে সম্ভব? কেন চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে? এর পেছনে রয়েছে এক অসম্ভব মিল, যা বিজ্ঞানীরা “কসমিক কয়েনসিডেন্স” বা মহাজাগতিক কাকতালীয় ঘটনা বলে অভিহিত করেন ।
সূর্যের ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে ৪০০ গুণ বড়। সূর্যের আয়তন পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লাখ গুণ বেশি। অন্যদিকে চাঁদ, আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ, যার ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। কিন্তু সূর্য পৃথিবী থেকে যত দূরে, চাঁদ তত দূরে নয়। সূর্য পৃথিবী থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে, আর চাঁদ পৃথিবী থেকে মাত্র ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ, সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে অবস্থিত ।
এবার অঙ্কটা মিলিয়ে দেখুন। সূর্যের ব্যাস চাঁদের ব্যাসের চেয়ে ৪০০ গুণ বড়। আবার সূর্য চাঁদের চেয়ে ৪০০ গুণ দূরে। এই দুটি সংখ্যার অলৌকিক মিলের কারণে পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য ও চাঁদ আকাশে একই রকম আকারের মনে হয়। যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে, তখন চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারে। ফলে সূর্যগ্রহণ হয়। এই কাকতালীয় ঘটনাটি পৃথিবী ছাড়া সৌরজগতের আর কোনো গ্রহে দেখা যায় না ।
মঙ্গল গ্রহে ফোবোস ও ডিমোস নামে দুটি চাঁদ আছে। এরা ছোট এবং খুব কাছাকাছি, ফলে সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের চাঁদগুলো অনেক বড় হলেও গ্রহ থেকে তাদের দূরত্ব অনেক বেশি। শুধু পৃথিবীতেই এই জ্যামিতিক মিলটি বিদ্যমান। এ কারণে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ শুধু পৃথিবীতেই দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর বয়স ৪.৫ বিলিয়ন বছর। এই দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদ পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে, বহু কোটি বছর পরে, চাঁদ এত দূরে সরে যাবে যে সূর্যকে আর পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না। তখন পৃথিবী থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না। আমরা এখন সময়ের এমন এক সুবিধাজনক অবস্থানে আছি, যেখানে এই অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাই ।
এই অদ্ভুত সত্য ঘটনাটি আমাদের মহাবিশ্বের প্রতি বিস্ময় আরও বাড়িয়ে দেয়। কোনো নিয়ন্ত্রক শক্তি কি এই মিলটি সৃষ্টি করেছে, নাকি এটি নিছকই কাকতালীয়? বিজ্ঞান যেমন বলুক, এই ৪০০ গুণের মিলটি আমাদের জন্য এক অনন্য উপহার। প্রতিবার সূর্যগ্রহণ দেখার সময় মনে রাখবেন, আপনি এমন এক মহাজাগতিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছেন, যা অন্য কোনো গ্রহে সম্ভব নয় ।
গল্প ৯: যে ব্যক্তি তিনবার ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন
“টাইটানিক”-এর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই রাতের ভয়াবহ দৃশ্য—বরফশীতল আটলান্টিকের জলে ডুবে যাওয়া হাজারো মানুষের আর্তনাদ। কিন্তু এমনও একজন মানুষ ছিলেন, যিনি কেবল টাইটানিক নয়, এর বোন জাহাজ ব্রিটানিক এবং আরেক দৈত্যাকার জাহাজ অলিম্পিক—এই তিনটি জাহাজ ডুবির সময় উপস্থিত ছিলেন এবং প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন। তার নাম ভায়োলেট জেসপ ।
১৮৮৭ সালে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া ভায়োলেট আইরিশ বংশোদ্ভূত এক নারী। বাবা অকালে মারা যাওয়ায় পরিবারের অভাব দূর করতে তিনি ২১ বছর বয়সে নার্সের চাকরি ছেড়ে জাহাজের “স্টুয়ার্ডেস” বা পরিচারিকার কাজ নেন। ১৯১০ সালে তিনি প্রথমবার আরএমএস অলিম্পিকে যোগ দেন। অলিম্পিক ছিল সে সময়ের অন্যতম বিলাসবহুল জাহাজ। ১৯১১ সালে অলিম্পিক ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ হক-এর সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। জাহাজের গায়ে বড় ফাটল ধরলেও ডুবতে বসেনি। তীব্র আতঙ্কের মধ্যে থেকে ভায়োলেট বেঁচে যান ।
এরপর তিনি টাইটানিকে যোগ দেন। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল, টাইটানিক তার প্রথম ও শেষ যাত্রা শুরু করে। ভায়োলেট সেদিন জাহাজেই ছিলেন। পাঁচ দিন পর, ১৫ এপ্রিল রাতে টাইটানিক আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা খায়। শুরু হয় তাণ্ডব। ভায়োলেটের দায়িত্ব ছিল যাত্রীদের লাইফবোটে ওঠাতে সাহায্য করা। কাজ শেষে তাকেও একটি বোটে উঠতে বলা হয়। তিনি প্রথমে যেতে চাননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অফিসারের নির্দেশে বোট নং ১৬-এ উঠে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই টাইটানিক ডুবে যায়। সেদিন রাতে ১৫০০ মানুষ মারা গেলেও ভায়োলেট বেঁচে যান ।
টাইটানিক ডুবির পর বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। ভায়োলেট কিছুদিন কাজ বন্ধ রাখেন। কিন্তু পরে আবার জাহাজের কাজে ফিরে যান। এবার তিনি যোগ দেন ব্রিটানিক-এ, যা টাইটানিকের বোন জাহাজ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটানিককে হাসপাতাল জাহাজে রূপান্তরিত করা হয়। ভায়োলেট সেখানে নার্স হিসেবে কাজ নেন। ১৯১৬ সালের ২১ নভেম্বর, ভূমধ্যসাগরের কিয়া দ্বীপের কাছে ব্রিটানিক হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে। জার্মান সাবমেরিনের টর্পেডো আঘাত হেনেছিল জাহাজে। ৫৫ মিনিটের মধ্যে জাহাজ ডুবে যায়। কিন্তু ভায়োলেট আবার বেঁচে যান। তবে এ বারের ঘটনা ছিল আরও নাটকীয়। তিনি যখন লাইফবোট থেকে ঝাঁপ দিচ্ছিলেন, তখন তার মাথা জাহাজের নিচের দিকে চলে যায় এবং পানির নিচে টেনে নেওয়ার উপক্রম হয়। শেষ মুহূর্তে এক নাবিক তাকে টেনে তুলে বাঁচান। ব্রিটানিক ডুবিতে ৩০ জন মারা গেলেও ভায়োলেট বেঁচে যান ।
তিনবার জাহাজডুবির শিকার হয়েও তিনি বেঁচে যান। পরে তিনি হোয়াইট স্টার লাইন কোম্পানির হয়ে কাজ চালিয়ে যান এবং ১৯৫০ সালে তিনি অবসর নেন। ১৯৭১ সালে ৮৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান। ভায়োলেট জেসপের জীবন অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা। কেউ বলেন, তিনবার ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে বেঁচে ফেরা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ভায়োলেট প্রমাণ করেছিলেন, ভাগ্য যখন সঙ্গ দেয়, তখন সাগরের অতলে ডুবেও বেঁচে ওঠা যায় ।
গল্প ১০: ৬৬.৬ কিলোমিটার দূর্ঘটনা-ছবির দৃশ্য সত্যি হওয়ার মর্মান্তিক কাহিনি
হলিউডের সিনেমায় আমরা অনেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, সেই সব কাল্পনিক দৃশ্য কি বাস্তবে ঘটতে পারে? ১৯৭৬ সালের একটি কাল্ট ক্লাসিক হরর ফিল্ম “দ্য ওমেন”—যা “দ্য ওমেন” নামেই বেশি পরিচিত—ছবিটি মুক্তির পরপরই জড়িয়ে যায় এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর দুর্ঘটনায়, যা ছবির ঘটনার সঙ্গেই মিলে যায় ।
ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন রিচার্ড ডোনার। ছবির কাহিনি ছিল এক ভয়াবহ অভিশাপের গল্প। ছবির একটি দৃশ্যে একটি ছেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যায়। আরও একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ছেলেটির মা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। ছবির শুটিং চলাকালে শুরু হয় একের পর এক অমঙ্গল। ছবির প্রধান শিল্পী গ্রেগরি পেকের ছেলে এক গুলিতে আত্মহত্যা করেন। ছবির আরেক অভিনেতার মৃত্যু হয়। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন এক কলাকুশলী। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পর ।
ছবির আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন জন রিচার্ডসন। তিনি ছবির জন্য ডিজাইন করেছিলেন এক ভয়াবহ মৃত্যুর দৃশ্য। ১৯৭৬ সালের ১৩ আগস্ট, “ব্ল্যাক ফ্রাইডে” নামে কুখ্যাত দিনটি। জন রিচার্ডসন তার গার্লফ্রেন্ড লিজ মুরকে নিয়ে স্পেনের সেগোভিয়া প্রদেশে একটি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাদের গাড়িটি একটি খাদে পড়ে যায়। লিজ মুর সেখানেই মারা যান। তার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায়। জন রিচার্ডসন প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলের কাছে একটি রাস্তার সাইনবোর্ড ছিল। তাতে লেখা ছিল, “ওমেন ৬৬.৬ কিলোমিটার”। “ওমেন” শব্দটি ছিল কাছের একটি শহরের নাম, কিন্তু সংখ্যাটি ৬৬.৬, যা বাইবেলের “শয়তানের সংখ্যা” ৬৬৬-এর কাছাকাছি ।
এই ঘটনা জানাজানি হলে সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। ছবির নাম “দ্য ওমেন” আর সাইনবোর্ডের নাম “ওমেন”- এটি কি নিছক কাকতালীয়? আর সেই সংখ্যা ৬৬.৬? হলিউডের ইতিহাসে এই ঘটনা “দ্য ওমেন কার্স” নামে পরিচিত। অনেকের মতে, ছবির দৃশ্য যে সত্যি হয়ে যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এটি। পরে অবশ্য ছবির প্রযোজক ও পরিচালকরা এই সব গুজবকে অস্বীকার করেন। কিন্তু ততদিনে গল্পটি ছড়িয়ে পড়েছে। আজও ছবিটি যখন দেখানো হয়, দর্শকরা এই অদ্ভুত ঘটনার কথা মনে করে শিউরে ওঠেন ।
এই গল্প আমাদের শেখায়, শিল্প ও বাস্তবের সীমানা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। ছবির পর্দায় যা দেখি, তা হয়তো কোনো না কোনোভাবে বাস্তবের সঙ্গে মিলে যায়। আর সেই মিল যদি হয় মৃত্যুর, তবে তা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হল, দুর্ঘটনা ঘটেছিল, মানুষ মারা গিয়েছিল, আর সেই মৃত্যুর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল একটি সিনেমার অভিশাপের গল্প ।
মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প মজার মজার গল্প
আরও পড়ুন
অদ্ভুত রহস্য – ১ : ইতিহাসের গভীরে লুকানো অজানা অবিশ্বাস্য সত্য তথ্য
বিয়ার গ্রিলস এর অজানা গল্প যা আপনাকে শিখাবে ঝুঁকি, সাহস ও বেঁচে থাকার কৌশল
কানাডা নিয়ে অজানা ২১টি তথ্য- যা কানাডার ইতিহাস ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আপনার ধারণা পাল্টে দেবে