ঢাকা মেট্রোরেল বাংলাদেশের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সংযোজন। দীর্ঘ যানজট ও সময় অপচয়ের সমস্যা কমাতে এটি রাজধানীতে চালু করা হয়েছে। দেশের প্রথম মেট্রোরেল লাইন, এমআরটি লাইন-৬, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি উড়ালপথের ওপর নির্মিত। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড। প্রকল্পটির অর্থায়নে জাপানের Japan International Cooperation Agency গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিদ্যুৎচালিত এই ট্রেন পরিবেশবান্ধব এবং নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলাচল করে। আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যাত্রীসেবার দিক থেকে এটি বাংলাদেশের গণপরিবহনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
১. বিশ্বের ৬০তম দেশ হিসেবে মেট্রোরেল যাত্রা শুরু
অনেকে মনে করতে পারেন মেট্রোরেল এশিয়ার কোনো একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি আরও বড় পরিসরের। বিশ্বের ৬০তম দেশ হিসেবে ঢাকায় মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয় । এশিয়ার মধ্যে অবশ্য ২২তম দেশ হিসেবে এই তালিকায় নাম লেখায় বাংলাদেশ । বিশ্বে প্রথম মেট্রোরেল চালু হয় লন্ডনে ১৮৬৩ সালে, আর এশিয়ায় প্রথম টোকিওতে ১৯২৭ সালে । সেই হিসাবে মেট্রোরেল পেতে আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হয়নি, বরং আমরা প্রযুক্তির এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছি। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর থেকে এটি ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে ।
২. দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ও একমাত্র এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম
মেট্রোরেলে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যার নাম ‘এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম’ (ইএসএস) । এটি মূলত ব্যাটারির একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যা ট্রেন চলাচলের সময়ই শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। যদি কোনো কারণে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে এই সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে ট্রেনটি নিরাপদে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারবে। এই প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম এবং এশিয়ার মধ্যেও এটি অত্যন্ত আধুনিক একটি সংযোজন। এটি যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থা ট্রেনকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে বা বিদ্যুৎহীন অবস্থায়ও চলাচলের সক্ষমতা দেয়।
৩. জাপানেও ব্যবহার হয়নি এমন উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
ঢাকা মেট্রোরেলের আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই ট্রেনে যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো হয়েছে, তা এখনও জাপানিরা তাদের নিজ দেশের ট্রেনে ব্যবহার শুরু করেনি। অর্থাৎ, বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির একটি শীতাতপ ব্যবস্থা আমরা প্রথম থেকেই উপভোগ করছি। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রতিনিধিরাও এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা সত্যিই গর্বের। এই প্রযুক্তি ঢাকার উষ্ণ আবহাওয়ায় যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করে।
৪. ১১ কিলোভোল্ট বিদ্যুতায়ন ও বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে মেট্রোরেলের প্রতিটি জানালায় বুলেটপ্রুফ কাঁচ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইট বা হাতুড়ির আঘাতেও ভাঙবে না । এছাড়া ট্রেনের আসনগুলো ‘হেভি টেম্পার্ড’ প্রযুক্তিতে তৈরি শক্ত প্লাস্টিকের, যা সহজে ভাঙা বা নষ্ট করার মতো নয় । ট্রেনের ছাদে ওঠা বা জানালা দিয়ে কিছু নিক্ষেপের ঘটনা এড়াতেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এমনকি ট্রেনের বিদ্যুতায়ন ১১ কিলোভোল্টের হওয়ায় ছাদে ওঠা মানে জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি, তাই সেই পথও পুরোপুরি বন্ধ । প্রতিটি বগিতে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা যাত্রীদের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে ।
৫. প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা
মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা । কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগায় এবং মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের কারণে ব্যাপক খরচ বেড়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় । এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ (প্রায় ৭৫%) ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপানের জাইকা, বাকি অংশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করে । নির্মাণকাজে বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান হামলায় জাপানি প্রকৌশলীদের মৃত্যু এবং কোভিড-১৯ মহামারি ।
৬. প্রতিদিন যাত্রী পরিবহনের রেকর্ড ছাড়িয়েছে ৪ লাখ
মেট্রোরেল যখন প্রথম চালু হয়, তখন এর দৈনিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ লক্ষের বেশি । কিন্তু এর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে, ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এটি এক দিনে রেকর্ড সংখ্যক ৪ লাখ ৩ হাজার ১৬৪ জন যাত্রী পরিবহন করেছে । যদিও এটি সর্বোচ্চ সক্ষমতার চেয়ে কম, তবুও এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে অল্প সময়ের মধ্যেই মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনের কতটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতি ঘণ্টায় এটি প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম । প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারেন ।
৭. চালকবিহীন নয়, তবুও অটোমেশনে নিয়ন্ত্রিত চলাচল
মেট্রোরেল চলাচলের ক্ষেত্রে চালকের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত। ট্রেনটি মূলত ‘অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন’ (এটিও) প্রযুক্তির মাধ্যমে সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলে। একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (ওসিসি) থেকে পুরো সিস্টেম তদারকি করা হয়। ট্রেন কোথায় থামবে, কখন থামবে-এসব নির্ধারিত থাকে প্রোগ্রাম রুট কন্ট্রোলারের মাধ্যমে। ফলে চালকের কাজ শুধু জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, বাকি সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়। ট্রেনের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে । সম্পূর্ণ রুট অর্থাৎ উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত যেতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট ।
৮. প্রথম নারী চালক থেকে শুরু করে স্মারক নোট
মেট্রোরেলের প্রথম নারী চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মরিয়ম আফিজা, যা নারীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বিষয় । মেট্রোরেল উদ্বোধন উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোট চালু করেছে, যা সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান । মেট্রোরেলের লোগোর ডিজাইন করেছেন আলী আহসান নিশান । পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), যা ২০১৩ সালে গঠিত হয় । ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৬টি লাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে । ঢাকা মেট্রোরেল ঢাকা মেট্রোরেল ঢাকা মেট্রোরেল
আরও পড়ুন
স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কী? অবস্থান, আয়তন, ইতিহাস ও অজানা ১০ রহস্য
পৃথিবীর গভীরতম স্থান ” মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ” সম্পর্কিত অজানা ১০ রহস্য