নোবেল পুরস্কার কী ? এ পর্যন্ত একাধিকবার নোবেল বিজয়ী হয়েছেন যাঁরা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান, গবেষণা ও মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে যারা অসাধারণ অবদান রেখেছেন, তাঁদের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পুরস্কারকে ধরা হয়। ১৮৯৫ সালে সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল তাঁর সম্পদ দান করে যে পুরস্কারের সূচনা করেন, তা আজ বিশ্বজুড়ে মেধা, মনন ও মানবতার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিবছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতি-এই ছয়টি বিভাগে অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া হয় নোবেল পুরস্কার। তবে ইতিহাসে এমন বিরল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাঁরা একাধিকবার এই সম্মান অর্জন করেছেন। আজ আমরা নোবেল পুরস্কার কী এবং ২০২৫ খ্রীঃ পর্যন্ত একাধিকবার যাঁরা নোবেল বিজয়ী হয়েছেন সে সম্পর্কে জানব।

নোবেল পুরস্কার কী ?

নোবেল পুরস্কার হলো বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বার্ষিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যা সুইডেনের আলফ্রেড নোবেলের উইলের ভিত্তিতে প্রবর্তিত হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতি – এই ছয়টি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য এটি প্রদান করা হয়। সুইডিশ একাডেমি এবং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিজয়ীদের মনোনীত ও নির্বাচন করে থাকে। মানবকল্যাণ ও জ্ঞান অগ্রগতিতে অসামান্য সাফল্যকে সম্মানিত করাই এই পুরস্কারের প্রধান লক্ষ্য।

একাধিকবার নোবেল বিজয়ী যাঁরা

১. মারি কুরি

মারি কুরি ছিলেন পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করা এক মহান নারী বিজ্ঞানী, যিনি বিজ্ঞানের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তিনি প্রথম নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি ভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন।
নোবেল জয়: ২ বার
১ম পুরস্কার (১৯০৩) – পদার্থবিজ্ঞানে (স্বামী পিয়েরে কুরি ও অঁরি বেকেরেলের সঙ্গে যৌথভাবে)।
২য় পুরস্কার (১৯১১) – রসায়নে, রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম মৌল আবিষ্কারের জন্য।
তিনি রেডিওসক্রিয়তা নিয়ে এমন গবেষণা করেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পরমাণু বিজ্ঞানে বিপ্লব আনে। তাঁর আবিষ্কারের ফলেই আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিয়েশন থেরাপির সূচনা হয়। মারি কুরি ছিলেন এক নির্ভীক নারী, যিনি পুরুষশাসিত সমাজে নিজের যোগ্যতায় বিশ্বকে মুগ্ধ করেন। রেডিয়েশনের প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর অবদান আজও অমর। তিনি বিজ্ঞানের জগতে চিরদিনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

২. লিনাস পাউলিং

লিনাস পাউলিং ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশিষ্ট রসায়নবিদ, শান্তিকর্মী ও মানবতাবাদী। তিনি ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি পৃথক নোবেল পুরস্কার এককভাবে অর্জন করেছেন।
নোবেল জয়: ২ বার
১ম পুরস্কার (১৯৫৪) – রসায়নে, রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতি ও অণুর গঠন নিয়ে গবেষণার জন্য।
২য় পুরস্কার (১৯৬২) – শান্তিতে, পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার জন্য।
তাঁর রসায়ন গবেষণা আধুনিক মলিকুলার কেমিস্ট্রির ভিত্তি স্থাপন করে। একই সঙ্গে তিনি মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন, যুদ্ধবিরোধী প্রচারণায় ছিলেন অগ্রণী। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহার হওয়া উচিত। লিনাস পাউলিং ছিলেন জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর নাম আজও ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক মানবিক বিজ্ঞানী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

৩. জন বার্ডিন

জন বার্ডিন ছিলেন মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি প্রযুক্তি জগতে অমর অবদান রেখে গেছেন। তিনি ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুইবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন।
নোবেল জয়: ২ বার
১ম পুরস্কার (১৯৫৬) – পদার্থবিজ্ঞানে, ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের জন্য (সহ-জয়ী: উইলিয়াম শকলি ও ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন)।
২য় পুরস্কার (১৯৭২) – পদার্থবিজ্ঞানে, সুপারকন্ডাক্টিভিটি (BCS তত্ত্ব) নিয়ে গবেষণার জন্য।
ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার আধুনিক কম্পিউটার, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক যুগের সূচনা ঘটায়। আর সুপারকন্ডাক্টিভিটি তত্ত্ব শক্তি সঞ্চয় ও পরিবহনে বিপ্লব আনে। তিনি ছিলেন বিনয়ী, মনোযোগী ও জ্ঞানান্বেষী এক গবেষক। খ্যাতি নয়, বিজ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। জন বার্ডিনের অবদান ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ কল্পনাও করা যেত না।

৪. ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার

ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ছিলেন ব্রিটিশ বায়োকেমিস্ট, যিনি জীববিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি দু’বার রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন এবং জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
নোবেল জয়: ২ বার
১ম পুরস্কার (১৯৫৮) – রসায়নে, ইনসুলিন প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্স নির্ধারণের জন্য।
২য় পুরস্কার (১৯৮০)-রসায়নে, ডিএনএ সিকোয়েন্সিং পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য।
তিনি প্রথম বিজ্ঞানী যিনি কোনো প্রোটিনের পূর্ণ গঠন উন্মোচন করেন। তাঁর উদ্ভাবিত “স্যাঙ্গার পদ্ধতি” আজও জিনোম গবেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্যাঙ্গার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নিবেদিতপ্রাণ গবেষক, খ্যাতির চেয়ে কাজেই ছিলেন বেশি মনোযোগী। তাঁর গবেষণা মানবদেহের জিনগত গঠন বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিজ্ঞানে নিষ্ঠা ও মানবকল্যাণের প্রতি ভালোবাসাই সর্বোচ্চ সাফল্যের চাবিকাঠি।

৫. আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC)

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি হলো মানবতার সেবায় নিবেদিত একটি বৈশ্বিক সংস্থা। তারা যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সময় আহত, অসহায় ও শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ায়।
নোবেল জয়: ৩ বার
১ম পুরস্কার (১৯১৭) – প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মানবিক সহায়তার জন্য।
২য় পুরস্কার (১৯৪৪) – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মানবসেবার জন্য।
৩য় পুরস্কার (১৯৬৩) – মানবতার সেবায় শতবর্ষব্যাপী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে।
তারা ধর্ম, জাতি, বা রাজনীতি নির্বিশেষে মানবিক সাহায্য প্রদান করে। রেড ক্রসের কাজ বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের মানবিক কার্যক্রম কোটি মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। রেড ক্রস আজও মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীকগুলোর একটি।

৬. জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR)

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বা UNHCR হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংস্থাগুলোর একটি। তারা যুদ্ধ ও সংকটে বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয়, সহায়তা ও নিরাপত্তা দেয়।
নোবেল জয়: ২ বার
১ম পুরস্কার (১৯৫৪) – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের শরণার্থীদের সহায়তার জন্য।
২য় পুরস্কার (১৯৮১) – বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তার স্বীকৃতিস্বরূপ।
UNHCR শান্তি ও মানবতার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। তারা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর জীবন পুনর্গঠনে অবদান রেখেছে। তাদের কার্যক্রম মানবাধিকারের সুরক্ষা ও সহমর্মিতা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এই সংস্থার নীতিই হলো-“প্রত্যেক মানুষ নিরাপদ জীবনের অধিকারী।” UNHCR আজও মানবতার সেবায় নিরন্তরভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নোবেল পুরস্কার কী

See also

সফলতা অর্জনের জন্য যে মৌলিক দক্ষতাগুলো থাকা জরুরি

১১৮ টি মৌলের নাম , প্রতীক ও বৈশিষ্ট্য- বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য গাইড

কানাডা নিয়ে অজানা ২১টি তথ্য- যা কানাডার ইতিহাস ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আপনার ধারণা পাল্টে দেবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top