লিপ ইয়ার কী ? লিপ ইয়ার কেন হয় ? জানুন এ সম্পর্কে অজানা মজার তথ্য

ক্যালেন্ডারের পাতায় মহাজাগতিক সময়ের সঠিক ছন্দ ধরে রাখার এক অনন্য বৈজ্ঞানিক সমাধান হলো লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষ। আমাদের ৩৬৫ দিনের সাধারণ বছর আসলে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার প্রকৃত সময়ের চেয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা কম, যা দীর্ঘমেয়াদে ঋতুচক্রের হিসাবে গরমিল তৈরি করে। সময়ের এই সূক্ষ্ম ব্যবধানটুকু মেটাতেই প্রতি চার বছর অন্তর ক্যালেন্ডারে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করে প্রকৃতির সাথে আমাদের হিসাবকে সমন্বয় করা হয়। এই একটি বিশেষ দিনের অভাব থাকলে কয়েক শতাব্দী পর দেখা যেত-আমাদের উৎসবের ক্যালেন্ডার আর প্রকৃতির ঋতু বদলে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারির এই অস্তিত্ব কেবল গাণিতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি সময়ের বিবর্তনে মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তার এক চমৎকার নিদর্শন। আজ আমরা জানব, লিপ ইয়ার কী ? লিপ ইয়ার কেন হয় এবং এর সম্পর্কে অজানা মজার তথ্য।

লিপ ইয়ার কী ?

লিপ ইয়ার (Leap Year) বা অধিবর্ষ হলো সেই বছর যা সাধারণ বছরের তুলনায় এক দিন বেশি হয়। সাধারণ বছরে ৩৬৫ দিন থাকে, কিন্তু লিপ ইয়ারে থাকে ৩৬৬ দিন। ফেব্রুয়ারি মাসে লিপ ইয়ারে ২৯ দিন থাকে, যেখানে সাধারণ বছরে ফেব্রুয়ারি হয় ২৮ দিন।

লিপ ইয়ার কেন হয় ?

পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড (প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন)। প্রতি বছর এই বাড়তি ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট জমা হতে থাকে। প্রায় ৪ বছর পর তা প্রায় পুরো ১ দিনে দাঁড়ায়। সেই বাড়তি দিনটি ফেব্রুয়ারি মাসে যোগ করে দেওয়া হয়, যাতে পঞ্জিকা ও ঋতুর সাথে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।

লিপ ইয়ার নিয়ে মজার তথ্য

  • জুলিয়াস সিজার প্রথম লিপ ইয়ার চালু করলেও রোমানরা শুরুতে গণনায় ভুল করেছিল। তারা প্রতি তিন বছর পর পর লিপ ইয়ার পালন করতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে সম্রাট অগাস্টাস সংশোধন করে প্রতি চার বছরে নিয়ে আসেন।
  • টেক্সাসের ‘অ্যানথনি’ শহরকে বিশ্বের লিপ ইয়ার রাজধানী বলা হয়। প্রতি চার বছর পর পর এখানে চার দিনব্যাপী বিশাল উৎসব হয় এবং সারা বিশ্বের ‘লিপ ইয়ার বেবি’রা এখানে আমন্ত্রিত হন।
  • আয়ারল্যান্ডে একটি প্রাচীন প্রথা আছে যেখানে লিপ ইয়ারে মেয়েরা ছেলেদের বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে। কথিত আছে, ৫ম শতাব্দীতে সেন্ট ব্রিজেট ও সেন্ট প্যাট্রিক এই প্রথার প্রচলন করেছিলেন।
  • ডেনমার্কে যদি কোনো পুরুষ লিপ ইয়ারে কোনো নারীর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তবে তাকে জরিমানা হিসেবে ১২ জোড়া দস্তানা দিতে হয়। ফিনল্যান্ডে একই পরিস্থিতিতে দস্তানা বা স্কার্টের কাপড় দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত আছে।
  • যারা ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তাদের ‘লিপলিং’ বা ‘লিপার’ বলা হয়। বিশ্বে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ আছেন যারা এই বিশেষ দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং প্রতি চার বছর পর পর প্রকৃত জন্মদিন পালন করেন।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিপ ইয়ার চার বছর পর পর আসে, কিন্তু মাঝে মাঝে এটি আট বছর পরেও আসতে পারে। যেমন ১৮৯৬ সালের পর পরবর্তী লিপ ইয়ার ছিল ১৯০৪ সাল, কারণ ১৯০০ সাল এই তালিকার বাইরে ছিল।
  • শুধু লিপ ইয়ার নয়, সময়ের সূক্ষ্ম ব্যবধান ঠিক রাখতে বিজ্ঞানীরা মাঝে মাঝে ‘লিপ সেকেন্ড’ যুক্ত করেন। পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সামান্য পরিবর্তনের কারণে পরমাণু ঘড়ির সাথে সময়ের সামঞ্জস্য রাখতে এটি করা হয়।
  • আপনি যদি মাসিক বেতনে চাকরি করেন, তবে লিপ ইয়ারে আপনি একদিন অতিরিক্ত কাজ করছেন কিন্তু বাড়তি বেতন পাচ্ছেন না। বছরের মোট দিন বেশি হওয়ায় এই দিনে আপনার দৈনিক মজুরি অন্য বছরের তুলনায় কিছুটা কম পড়ে।
  • আয়ারল্যান্ডের কিওগ পরিবারে টানা তিন প্রজন্ম লিপ ইয়ারে জন্মগ্রহণ করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। দাদু, বাবা এবং মেয়ে-তিনজনেরই জন্ম তারিখ ২৯ ফেব্রুয়ারি, যা গাণিতিকভাবে ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
  • সাধারণ ক্যালেন্ডারে লিপ ইয়ার মানে একটি দিন বাড়ে, কিন্তু হিব্রু ক্যালেন্ডারে পুরো একটি ‘মাস’ যোগ করা হয়। ১৯ বছরের একটি চক্রে মোট সাতবার এই অতিরিক্ত মাসটি যুক্ত করা হয় যাতে ধর্মীয় উৎসবগুলো সঠিক ঋতুতে পড়ে।
  • ইতিহাসে জেমস মিলনে উইলসন নামে একজন ব্রিটিশ রাজনীতিকের জীবন বেশ অদ্ভুত। তিনি ১৮১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ঠিক তাঁর ৭২তম জন্মদিনে (১৮৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি) মৃত্যুবরণ করেন।
  • ১৭১২ সালে সুইডেন তাদের ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের সময় একটি বিশাল ভুল করেছিল। সেই ভুল সংশোধনের জন্য তারা ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে ২৯ তারিখের পর ৩০ তারিখও যুক্ত করেছিল, যা ইতিহাসের একমাত্র ‘৩০শে ফেব্রুয়ারি’।
  • ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজেডি টাইটানিক জাহাজটি যে বছর ডুবেছিল, ১৯১২ সালটি ছিল একটি লিপ ইয়ার। যদিও এর সাথে দুর্ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই, তবে অনেক কুসংস্কারবাদীরা একে অশুভ বছরের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
  • ইথিওপিয়াতে এখনো একটি ভিন্ন ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয় যেখানে বছরে ১৩টি মাস থাকে। সেখানে বছরের প্রথম ১২টি মাস ৩০ দিনে হয় এবং ১৩তম মাসটি লিপ ইয়ারে ৬ দিন এবং সাধারণ বছরে ৫ দিনে শেষ হয়।
  • আধুনিক অলিম্পিক গেমসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি সাধারণত লিপ ইয়ারেই অনুষ্ঠিত হয়। যেমন ২০০৪, ২০০৮, ২০১২, ২০১৬-প্রতিটি আসরই এক একটি লিপ ইয়ারে বসেছিল।
  • অনেক দেশে ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের আইনগত বয়স নিয়ে বিশেষ নিয়ম আছে। যেমন যুক্তরাজ্যে ২৯ ফেব্রুয়ারির জন্মদিনের আইনি সুবিধা ১লা মার্চ থেকে কার্যকর হয়, আবার নিউজিল্যান্ডে এটি ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকেই গণ্য করা হয়।
  • নরওয়ের কারিন হেনরিকসেন ১৯৬০, ১৯৬৪ ও ১৯৬৮ সালের পর পর তিনটি লিপ ইয়ারে সন্তান প্রসব করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছেন।
  • ফ্রান্সের ‘লা বুগি দু সাপুর’ নামক একটি প্যারোডি সংবাদপত্র শুধুমাত্র লিপ ইয়ারের ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়।
  • গ্রিসের ঐতিহ্য অনুযায়ী, লিপ ইয়ারে-বিশেষ করে ২৯ ফেব্রুয়ারি-বিয়ে করলে সেই দাম্পত্য জীবনে ডিভোর্স হবে বলে বিশ্বাস করা হয়, তাই অনেক গ্রিক দম্পতি লিপ ইয়ার এড়িয়ে চলেন।

জেনে রাখুন

লিপ ইয়ার নির্ণয়ের নিয়ম হলো – যে বছর ৪ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য হয়, সেই বছর সাধারণত লিপ ইয়ার ধরা হয়; তবে যদি বছরটি ১০০ দিয়ে বিভাজ্য হয়, তাহলে সেটি লিপ ইয়ার নয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম হিসেবে, যে বছর ৪০০ দিয়ে বিভাজ্য হয়, সেটি আবার লিপ ইয়ার হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, কোনো বছর লিপ ইয়ার কি না তা নির্ধারণ করতে প্রথমে ৪ দিয়ে ভাগ করতে হবে, তারপর ১০০ এবং প্রয়োজনে ৪০০ দিয়ে বিভাজ্যতা যাচাই করতে হবে। লিপ ইয়ার কেন হয়

আরও পড়ুনঃ

শিক্ষণীয় ১০টি মজার মজার গল্প – যা আপনাকে সত্যিই অবাক করবে

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কী? অবস্থান, আয়তন, ইতিহাস ও অজানা ১০ রহস্য

বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার : যে ২৮ উদ্ভাবন বদলে দিয়েছে মানব সভ্যতাকে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top