বই পড়ার উপকারিতা ও বই নিয়ে ২৭টি অজানা চমকপ্রদ তথ্য

বই মানুষের জীবনে জ্ঞানের এক অনন্য উৎস, যা চিন্তাশক্তি ও কল্পনাকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয়। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস আমাদের মানসিক বিকাশ, মনোযোগ বৃদ্ধি এবং ভাষাগত দক্ষতা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও বইয়ের গুরুত্ব একটুও কমেনি, বরং তা আরও বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। অনেকেই হয়তো জানেন না, বইকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য অজানা ও চমকপ্রদ তথ্য, যা জানলে বিস্মিত হতে হয়। এই তথ্যগুলো শুধু জ্ঞান বাড়ায় না, বরং বইয়ের প্রতি আগ্রহও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। আজ আমরা বই পড়ার উপকারিতা ও বই নিয়ে ২৭টি অজানা চমকপ্রদ তথ্য সম্পর্কে জানব।

বই পড়ার উপকারিতা

  • পড়ার সময় মস্তিষ্কের একাধিক অঞ্চল একসঙ্গে সক্রিয় হয়, যা Neuroplasticity (মস্তিষ্কের নমনীয়তা) বাড়ায়। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা বলছে, পড়া মস্তিষ্ককে শারীরিক ব্যায়ামের মতোই ‘ফিট’ রাখে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার (Dementia) ঝুঁকি কমায়।
  • সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬ মিনিট নীরবে পড়লে হার্টরেট কমে ও পেশির টান ছেড়ে দেয়, যা স্ট্রেস কমাতে সঙ্গীত শোনা বা চা পান করার চেয়েও বেশি কার্যকর। এই কারণেই থেরাপিস্টরা অ্যাংজাইটি ম্যানেজমেন্টে বই পড়ার পরামর্শ দেন।
  • স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন নষ্ট করলেও, কাগজের বই পড়লে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ‘স্লিপ মোডে’ যায়। এভিডেন্স-ভিত্তিক স্টাডি বলছে, ঘুমানোর আগে ২০ মিনিট ফিকশন পড়লে অনিদ্রা কমে ও ঘুম বাড়ে।
  • সাফল্যের পরেও ‘আমি যোগ্য নই’ ভাবনাটি কমে যখন আপনি দেখেন অন্যের চিন্তার জটিলতাও আপনার মতোই। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জানায়, নন-ফিকশন ও জীবনী পড়া আত্ম-সন্দেহ কমিয়ে আত্মবিশ্বাসের রিয়েলিস্টিক বেস তৈরি করে।
  • মস্তিষ্ক একটি গল্প পড়ার সময় ইভেন্ট, চরিত্র, প্লট সব ধারণ করতে বাধ্য হয়, যা সিনাপ্সকে শক্তিশালী করে। নিউরোইমেজিং স্টাডি দেখিয়েছে, যারা নিয়মিত পড়েন তাদের  মেমরির মূল কেন্দ্র (Hippocampus) বয়স বাড়লেও সঙ্কুচিত হতে চায় না।
  • ফিল্ম বা সিরিজের চেয়ে বই বেশি ‘থিওরি অফ মাইন্ড’ (অন্যের মানসিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতা) বাড়ায়, কারণ আপনি নায়কের ভেতরের দ্বিধা ও ভিলেনের যুক্তি সরাসরি পড়েন। এর ফলাফল হলো বাস্তব জীবনে যুক্তি দিয়ে ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা।
  • গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সাহিত্য পড়েন তারা অন্যের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ও টোনালিটির ছোট পরিবর্তন দ্রুত ধরতে পারেন। অর্থাৎ, বই আপনাকে ‘স্মার্টের চেয়ে বেশি বোধগম্য’ করে তোলে, যা লিডারশিপের জন্য গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড।
  • দিনের শেষে সিদ্ধান্ত নিতে ক্লান্ত লাগে-একে বলে ইগো ডিপ্লিশন। নিয়মিত পড়া মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের এনার্জি এফিশিয়েন্সি বাড়ায়, ফলে আপনি দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
  • নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় পাওয়া গেছে, যারা মধ্যবয়সে সপ্তাহে অন্তত দু’বার পড়তেন, তাদের বয়স ৭০-এর পরেও অ্যালঝাইমার হওয়ার প্রবণতা কম ছিল। পড়া একটি ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ তৈরি করে, যা ব্রেইন সেল নষ্ট হলেও কাজ চালিয়ে যায়।
  • আপনি চোখ বোলান, তখন চোখের ক্ষুদ্র পেশি (Ciliary and extraocular) বইয়ের অক্ষর অনুসরণ করতে থাকে এবং দেখা গেছে এটি মিরর নিউরন সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করে। ফলে আপনি শুধু বোঝেন না, শরীরের ভেতরে ‘অনুভব’ করতে শুরু করেন অন্যের আবেগ-যা স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে হয় না।
  • বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক চাপ প্রায় ৬৮ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। মাত্র ৬ মিনিট বই পড়লে হৃদস্পন্দন ও পেশির উত্তেজনা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
  • শিশু বয়সে বই পড়ার অভ্যাস IQ উন্নত করতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলায় বেশি পড়েছে তাদের জ্ঞানীয় দক্ষতা বেশি।

বই নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য

1. প্রাচীন মিশরে পাঠাগারগুলোকে বলা হতো ‘আত্মার চিকিৎসালয়’। তারা বিশ্বাস করতেন যে বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের মনের অসুখ বা মানসিক অস্থিরতা নিরাময় সম্ভব।

2. বিশ্বের সবচেয়ে দামি বই হলো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির লেখা ‘দ্য কোডেক্স লেস্টার’। বিল গেটস ১৯৯৪ সালে এটি প্রায় ৩০.৮ মিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন।

3. জন মিল্টনের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’ লেখার সময় তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ ছিলেন। তিনি মুখে মুখে পঙ্ক্তিগুলো বলতেন এবং তার কন্যারা তা লিখে রাখতেন।

4. হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে এমন কিছু বই আছে যেগুলোর মলাট মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধানো। ১৯শ শতাব্দীতে ‘অ্যানথ্রোপোডার্মিক বিবলিওপেজি’ নামক এই প্রথাটি প্রচলিত ছিল।

5. নরওয়েতে কোনো লেখক বই প্রকাশ করলে এবং তা মানসম্মত হলে সরকার সেই বইয়ের ১০০০ কপি কিনে নেয়। এই কপিগুলো দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।

6. মধ্যযুগে লাইব্রেরিতে বইগুলো বুকসেলফের সাথে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। বই চুরি ঠেকানোর জন্যই তৎকালীন সময়ে এই অদ্ভুত নিয়ম প্রচলিত ছিল।

7. আইসল্যান্ডে ‘Jolabokaflod’ নামে একটি চমৎকার উৎসব হয় যেখানে বড়দিনে সবাই একে অপরকে বই উপহার দেয়। সেই রাতে পুরো জাতি একসাথে বসে নতুন বই পড়ে সময় কাটায়।

8. ‘অ্যাবিবলিওফোবিয়া’ (Abibliophobia) হলো এমন এক ধরনের ভয়, যেখানে মানুষ পড়ার মতো কোনো বই খুঁজে না পাওয়ার আতঙ্কে ভোগে। যারা খুব বেশি বই পড়েন, তাদের মধ্যে এই ভয় কাজ করে।

9. বইয়ের পাতার ভাঁজ করার অভ্যাসকে বলা হয় ‘ডগ-ইয়ার্ড’ (Dog-eared)। তবে প্রকৃত বইপ্রেমীদের কাছে এটি বইয়ের অমর্যাদা হিসেবে বিবেচিত হয়।

10. উইনস্টন চার্চিল যখন তার স্মৃতিকথা লিখছিলেন, তখন তিনি দশ লক্ষেরও বেশি শব্দ টাইপ করেছিলেন। তার এই বিশাল কর্মের জন্য তিনি ১৯৫৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

11. পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম বইটির নাম ‘Teeny Ted from Turnip Town’। এটি খালি চোখে পড়া অসম্ভব এবং এটি পড়তে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়।

12. ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লে মিজারেবল’-এ বিশ্বের দীর্ঘতম বাক্যগুলোর একটি রয়েছে। বইটির এক জায়গায় একটি বাক্য প্রায় ৮২৩টি শব্দ নিয়ে গঠিত।

13. সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ শব্দ পড়ার সক্ষমতা থাকে। তবে দক্ষ পাঠকরা এর চেয়েও অনেক দ্রুত পড়তে পারেন।

14. বিশ্বের বৃহত্তম পাঠাগার হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’। এখানে প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি বই ও নথিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে।

15. ‘বিবলিওফ্যাগি’ (Bibliophagy) হলো বই পড়ার পাশাপাশি বইয়ের পাতা ছিঁড়ে খাওয়ার একটি বিরল মানসিক অবস্থা। ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের কথা জানা যায় যারা আক্ষরিক অর্থেই বই চিবিয়ে খেতেন।

16. আগাথা ক্রিস্টি হলেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বইয়ের লেখক। তার রহস্য উপন্যাসগুলো এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে।

17. পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই হলো ‘ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট’। এটি এমন এক ভাষায় লেখা যা আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো কোড ব্রেকার বা ভাষাবিদ উদ্ধার করতে পারেননি।

18. ‘বিবলিওক্লেপসোম্যানিয়া’ হলো এমন এক অদ্ভুত রোগ যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি বই চুরি না করে শান্তি পান না। স্টিফেন ব্লুমবার্গ নামক এক ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২৩,০০০ দুর্লভ বই চুরি করেছিলেন।

19. বিখ্যাত লেখক ফ্রাঞ্জ কাফকা মারা যাওয়ার আগে তার বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে সমস্ত অপ্রকাশিত লেখা পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে ব্রড বন্ধুর সেই অনুরোধ রক্ষা না করে পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশ করেন বলেই আজ আমরা ‘দ্য ট্রায়াল’-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্য পড়ার সুযোগ পাচ্ছি।

20. পৃথিবীর বৃহত্তম ডিকশনারি বা অভিধান হলো ‘অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’। এটি প্রথমবার সম্পূর্ণ করতে সম্পাদকদের প্রায় ৭০ বছর সময় লেগেছিল।

21. মহাকাশচারীরা মহাকাশে যাওয়ার সময়ও বই নিয়ে যান, তবে সেগুলো ওজনে খুব হালকা কাগজের হয়। বর্তমানে অবশ্য তারা মূলত ই-বুক ব্যবহার করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

22. রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি একবার প্রমাণ করেছিল যে পুরনো বইয়ের ঘ্রাণে ভ্যানিলা এবং কাজু বাদামের হালকা রেশ পাওয়া যায়। কাগজের সেলুলোজ নষ্ট হওয়ার ফলে এই সুগন্ধি রাসায়নিক নির্গত হয়।

23. বই পড়া মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে থেরাপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিকে “bibliotherapy” বলা হয়।

24. উইলিয়াম শেক্সপিয়র তার লেখা বইগুলোতে ইংরেজি ভাষায় প্রায় ১,৭০০টি নতুন শব্দ যোগ করেছিলেন। ‘লুনি’ (Loony) বা ‘গসিপ’ (Gossip)-এর মতো শব্দগুলো তার মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা পায়।

25. ব্রাজিলের একটি কারাগারে কয়েদিরা বই পড়লে তাদের সাজা কমিয়ে দেওয়া হয়। একটি বই পড়লে এবং তার ওপর প্রতিবেদন জমা দিলে তাদের সাজা ৪ দিন কমে যায়।

26. কাগজের বই পড়া স্ক্রিনে পড়ার তুলনায় বেশি মনে থাকে। কারণ প্রিন্টেড টেক্সট পড়ার সময় মস্তিষ্ক স্থানিক (spatial) স্মৃতি ব্যবহার করে।

27. সবচেয়ে বেশি বার চুরি হওয়া বইয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’। এটি একটি মজার রেকর্ড যে, রেকর্ড বই নিজেই চুরির রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে। বই পড়ার উপকারিতা বই পড়ার উপকারিতা

আরও পড়ুনঃ

শিক্ষণীয় ১০টি মজার মজার গল্প – যা আপনাকে সত্যিই অবাক করবে

পৃথিবীর গভীরতম স্থান ” মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ” সম্পর্কিত অজানা ১০ রহস্য

রোমান সাম্রাজ্য কী? জানুন, রোমের কলোসিয়ামের স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে বিস্ময়কর ১২ তথ্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top